মৃত্যুঞ্জয়ী তৃষ্ণা ৪২ (Trishna) Poem by Arun Maji

মৃত্যুঞ্জয়ী তৃষ্ণা ৪২ (Trishna)

ভালোবাসলে কাঁদতে হয়।

গুমড়ে গুমড়ে কাঁদতে হয়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে হয়। উচ্চৈঃস্বরে গলা ছেড়ে কাঁদতে হয়।

ভলোবাসলে, চোখের জলে নদী বানাতে হয়। বুকের যন্ত্রণায় সুর বাঁধতে হয়। হতাশার দীর্ঘশ্বাসে বাঁশি বাজাতে হয়।

কাঁদতে হয়, তবুও ভালোবাসতে হয়। চোখের জল ফেলতে হয়, তবুও আরো বেশি ভালোবাসার স্বপ্ন দেখতে হয়।

ভালোবাসা ছাড়া মানুষের উপায় কি? লবঙ্গ দারুচিনি ছাড়া যেমন খাবারে সুগন্ধ আসে না, তেমনি ভালোবাসা ছাড়া জীবনে সুগন্ধ আসে না। দীর্ঘ একটা জীবন, সুগন্ধ ছাড়া বাঁচা যায় কি?

ভালোবাসাতে যন্ত্রণা আছে। কিন্তু সেই যন্ত্রণাতে মধু আছে। সেই মধু, স্বর্গের অমৃত দিয়ে তৈরী। সেই অমৃতভান্ডে, ঈশ্বরেরও ঈর্ষা হয়।

বাড়িতে পৌঁছে সোফায় বসে আছি। বসে আছি ঠিক নয়, ভাবছি। আকাশ পাতাল ভাবছি। হটাৎ কাঁধে কারও ছোঁয়া লাগলো। চেয়ে দেখি, তৃষ্ণা। ও জিজ্ঞেস করলো আমাকে-
'কিরে, কি ভাবছিস? '

হাসলাম আমি। কিন্তু কোন উত্তর করলাম না। আবার জিজ্ঞেস করলো ও -
'কিরে, এত চুপচাপ কেন? '

এবারও কোন উত্তর করলাম না আমি। চোখদুটো ছল ছল করছে আমার। দূরে কাকীমা বসে ছিলেন। হয়তো আমাকে দেখে কিছু একটা বুঝলেন উনি।

চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন উনি। আমার পাশে সোফায় বসলেন। তারপর আমার মাথাটা ওনার বুকের মধ্যে নিয়ে বললেন-
'মন খারাপ? যখনই চাইবি, তখনই চলে আসিস তুই।'

তৃষ্ণা ওর মাকে উদ্দেশ করে বললো-
'কি করে আসবে ও? কয়েকমাস পর ফাইনাল পরীক্ষা ওর।'

কাকীমা
'সে ও সামলে নেবে। তোকে ভাবতে হবে না।'  

তৃষ্ণা
'এত সহজ নয় মা। হ্যারিসনের সাইজ দেখেছো? দেখলে ভিরমি খাবে তুমি! '

মেঝেতে বসেছিলেন কাকু। তৃষ্ণার বোন ম্যারো পরীক্ষার কাগজগুলো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছিলেন উনি। তৃষ্ণাকে জিজ্ঞেস করলেন-
'হ্যারিসন! হ্যারিসন কি? '

তৃষ্ণা
'ওর মেডিসিনের বই। দুটো পাহাড় সাইজ ভলিউম।'

হেসে ফেললাম আমি। তৃষ্ণার উদ্দেশে বললাম-
'ধুস, হ্যারিসন পড়ে কেউ পরীক্ষা দেয় নাকি? '

তারপর কাকীমার উদ্দেশে আমি বললাম-
'কাল মায়ের কাছে যাবো কাকীমা। দুদিন মায়ের কাছে কাটিয়ে, হোস্টেলে ফিরবো আমি।'

কাকু মন্তব্য করলেন-
'অমল চলে যাচ্ছে, তো আমিও কাজে যাই এবার।'

কাকুর দিকে চেয়ে দেখলেন কাকীমা। শূন্য চোখে। তারপর কাকুর উদ্দেশে উনি বললেন-
'তোমরা সবাই চলে যাবে? '

ওনার কথার মধ্যে, গভীর এক বেদনা। ওনার কণ্ঠে, গভীর এক শূন্যতা। কাকীমার ব্যথা অনুভব করলেন কাকু। বললেন-
'যেতে কি আর ইচ্ছে হয় চৈতি? কিন্তু উপায় কি? টাকার সঞ্চয় শেষ।'

সোফা ছেড়ে, মেঝেতে বসলো তৃষ্ণা। ওর বাবার পাশে। বাবার কাঁধে হাত রেখে তার মেয়ে বললো-
'তুমিও চলে যাবে, বাপি? '

তৃষ্ণার দিকে চেয়ে দেখলেন কাকু। কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। চোখ ছল ছল করে উঠলো ওনার। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন-
'কিছুদিনের জন্য যেতে হবে মা। দরকার হলে ফোন করিস, চলে আসবো।'

সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলেন কাকীমা। চোখ থেকে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো ওনার। সিলিংয়ের দিকে চেয়েই মন্তব্য করলেন উনি-  
'ঘরটা এবার শূন্য হয়ে যাবে! '

শক্ত হওয়ার চেষ্টা করলেন কাকু। বললেন-
'শূন্য হবে কেন? অমল তো রইলো। মাঝে মাঝে আসবে ও।'

কথাগুলো বলে, আমার দিকে চেয়ে দেখলেন কাকু। মৃদু হাসার চেষ্টা করলাম আমি, কিন্তু হাসি ফুটলো না। কাকু এবার কাকীমার উদ্দেশে বললেন-
'তোমাদের এই দিন গুণা ব্যাপারটা ভালো লাগে না আমার। অমলের যখনই ইচ্ছে হবে, তখনই আসবে ও। এ বাড়িতেও পড়াশুনা করতে পারবে ও।'

ওর মায়ের উদ্দেশে তৃষ্ণা বললো-
'তুমি এত ভাবছো কেন মা? কঠিন সময়ে, আমাদেরকেও কঠিন হতে হবে।'

ভাবলাম, মুখে বলা বেশ সহজ। কিন্তু কাজে তা ঘটানো বেশ কঠিন। শক্ত হওয়া সহজ কথা নয়। মানুষ কেবল মরণশীলতাকে বুকে নিয়ে জন্মায় নি। ভঙ্গুরতাকেও সে বুকে নিয়ে জন্মেছে। তৃষ্ণা নিজেই জানে, ইচ্ছের সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব কতটা। চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার দূরত্ব ঠিক কতটা।

কথাগুলো বলে ওর মায়ের দিকে চেয়ে রইলো তৃষ্ণা। তৃষ্ণার কথা শুনে, হাসার চেষ্টা করলেন কাকীমা। তৃষ্ণা বললো-
'কাজের মধ্যে ডুবে গেলে, দুঃখ কম হবে। পড়ার মধ্যে ডুবে যাবো আমি।'  

তৃষ্ণাকে জড়িয়ে ধরলেন কাকু। বললেন-
'কয়েক সপ্তাহ পর দেখে যাবো তোকে।'

এবার উনি আমার দিকে চেয়ে বললেন-
'তোকে আজ চিলি চিকেন রান্না করে খাওয়াবো অমল।'

তৃষ্ণা
'চিলি চিকেন কেন? চিলি চিকেন খাওয়া আমার মানা।'

কাকু
'তোর জন্য স্পেশ্যাল চিলি চিকেন বানাবো।'

কাকুর উদ্দেশে কাকীমা বললেন-
'সেই ভালো। মন ভালো নেই আমার। তুমিই বরং রান্না করো।'

কাকুর উদ্দেশে জিজ্ঞেস করলাম আমি-
'আপনাকে সাহায্য করবো? '

কাকু
'নাহঃ তুই বরং পড়তে বোস। একটু একটু এগোতে থাক।'
© অরুণ মাজী

মৃত্যুঞ্জয়ী তৃষ্ণা ৪২ (Trishna)
Friday, October 8, 2021
Topic(s) of this poem: inspiration
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success