চড়াই উৎরাই ২৪ কার্গিল যুদ্ধ অবলম্বনে অরুণ মাজীর উপন্যাস
-----------
দেখতে দেখতে আরও ছ মাস কেটে গেলো। অর্থাৎ কার্গিল যুদ্ধ পরবর্তী আরও তিন বছর কেটে গেলো। কিন্তু সীমান্তের অবস্থার কোন পরিবর্তন হলো না। আজ একটু শান্ত তো কাল আবার তুমুল লড়াই।
অথচ বারবার শুনছি, রাজনৈতিক স্তরে আলোচনা চলছে। বারবার আলোচনা চলছে। কিন্তু ফল কিছু হচ্ছে না।
আলোচনার পর, কিছুদিন হয়তো শান্ত থাকছে সীমান্ত। কিন্তু আবার অশান্তি জেগে উঠছে। আবার সেই গোলাগুলির লড়াই। আবার সেই মৃত্যু চারিদিকে।
এই অশান্তি কেবল কার্গিল যুদ্ধ পরবর্তী সময় বলেই নয়। কাশ্মীর সমস্যা অস্ত্বিত্বমান, স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে। স্বাধীনতার পর থেকে, তিনটে বড় লড়াই লড়েছি আমরা। কিন্তু ছোটখাটো লড়াইয়ের সংখ্যা যে কতগুলো হবে, তার কোন মাপ জানা নেই।
কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কেন? কেন? সে প্রশ্নের উত্তর মাঝে মাঝে খুঁজি আমি। কিন্তু আমার খুঁজে পাওয়া উত্তরে কি দেশের সমস্যা মিটবে? তাছাড়া আমার খুঁজে পাওয়া উত্তর শুনবে কে? আমার মত সাধারণ মানুষকে, পাত্তা দেয় কে? তো আমার উত্তর কাকে বলবো আমি?
পড়শী দেশের প্রতি ঘৃণা আর যুদ্ধ, দেশনেতাদের- গদি টিকিয়ে রাখার একমাত্র অস্ত্র। তো দেশনেতারা কেন চাইবে, সেই অস্ত্র ত্যাগ করতে? দেশনেতারা কেন চাইবে, কাশ্মীর সমস্যা মিটে যাক? প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘৃণা হিংসা দাঙ্গা মুছে যাক?
পড়শীদেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে নেতারা প্রমান করতে চায়, তারা বড় দেশ ভক্ত। তারা সাহসী শক্তিশালী নেতা। তাই ভোট এলেই, সীমান্তে, সংঘাতের সুড়সুড়ি জেগে উঠে। দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি জেগে উঠে।
ভারত পাকিস্তন সংঘর্ষের এক ধর্মীয় কারণ আছে। কিন্তু সেই ধর্মীয় কারণ বেঁচে আছে কেন? তার উত্তর, রাজনৈতিক মুনাফা। রাজনৈতিক ইন্ধন ছাড়া ধর্মীয় সুড়সুড়ি বাঁচে না। এ কেবল ভারত পাকিস্তানের গল্প নয়। এ গল্প সারা পৃথিবীর। প্রাচীণ ইউরোপ, প্রাচীন মিশর, প্রাচীন মিডল-ইস্ট - সর্বত্র সেই একই গল্প। ধর্মকে ব্যবহার করে রাজা শক্তিশালী হয়েছে। আর রাজার পৃষ্ঠপোষকতায়, ধর্মীয় গুরুরা আরও বেশি ক্ষমতা আর সম্পদ ভোগ করেছে।
কাজেই, পঙ্গু অকর্মণ্য রাজনীতিকরা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন কাশ্মীর সমস্যা বেঁচে থাকবে। ধর্মীয় আর জাতি বিদ্বেষ বেঁচে থাকবে।
দোষী কেবল কোন এক দেশ বা কোন এক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়। দোষী সবাই। এমনকি দেশের নাগরিকও।
স্থির জলাশয় ছাড়া যেমন পদ্মফুটে না, তেমনি শান্ত দেশ ছাড়া দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে না। দেশ আর মানুষের মধ্যে শান্তি না থাকলে, কি করে তারা- ভালো কিছুর সাধনায় মনোনিবেশ করবে? সাধনা না করলে, উৎকৃষ্ট কিছু ঘটবে কি করে? যে বাড়িতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, সেই বাড়ির ছেলে কি পড়াশুনা বা অন্য কোন কর্ম করতে পারবে? নাহঃ। কারণ- সে আগুন নেভানোয় ব্যস্ত থাকবে।
দেশের মধ্যে অশান্তি চলতে থাকলে, মানুষ আর সরকার অশান্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। ঘৃণা হিংসা আর বিদ্বেষ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তো দেশের শিক্ষা স্বাস্থ্য শিল্প পরিকাঠামো ইত্যাদি নিয়ে তারা ভাববে কখন? যুদ্ধেই যদি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, তো শিক্ষা স্বাস্থ্য শিল্প পরিকাঠামোর জন্য অর্থ আসবে কোথা থেকে? কাজেই যুদ্ধ বা ঘৃণার মানসিকতা কখনো দেশপ্রেম হতে পারে না। যুদ্ধ এবং ঘৃণার মানসিকতা, দেশ ধ্বংস করার অনিবার্য অস্ত্র।
নাহঃ বড় ক্লান্ত আমি। চারিদিকে হিংসা দাঙ্গা রক্তপাত দেখতে দেখতে, বড় ক্লান্ত আমি। দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার বছর হয়ে গেলো। অথচ এখনো আমার পোস্টিং এলো না। দু বছর পোস্টিংয়ের মেয়াদ, চার বছর হয়ে গেলো। কি দুর্ভাগ্য, তাই না?
আর্মিতে, যাদের চেনা জানা আত্মীয় পরিজন আছে, তারা দু বছর শেষেই এই স্থান ত্যাগ করেছে। কিন্তু যারা আমাদের মত সাধারণ মানুষ, তারা এখনো এখানে আটকে রয়েছে। অথচ ইন্ডিয়ান আর্মি, দেশের শ্রদ্ধেয়তম প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই আর্মিও কলঙ্কমুক্ত হতে পারলো না। আর্মিতেও সেই ঘৃণ্য নেপোটিজম।
মেঘা বলেছিলো, ওর বাবার সাথে কথা বলতে। ওর বাবা পাঠানকোটের ব্রিগেড মান্ডার। হয়তো, কিছু একটা করতে পারতেন উনি। হয়তো পোস্টিংয়ের ব্যাপারে সাহায্য করতে পারতেন উনি। কিন্তু অন্যের কাছে কেন ভিক্ষা চাইবো আমি?
অঙ্কের মাস্টার বাসুবাবুকে মনে পড়ে গেলো। উনি মাঝে মাঝেই আমাকে শেখাতেন, 'সাগরে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কিবা ভয়! ' এত দূর পেরিয়ে এলাম, আর এখন লোকের কাছে ভিক্ষা চাইবো আমি?
নাহঃ কারও কাছে কখনো কোন ভিক্ষা চাইবো না আমি। কারও কাছ থেকে কখনো কোন দয়া গ্রহণ করবো না আমি। আমার মা আমাকে মানুষ দেখতে চেয়েছে। ভিখারী নয়। আমার মাকে কি আমি, ভিখারীর মা সাজাতে পারি?
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem