চড়াই উৎরাই ৩৬ (Trishna) Poem by Arun Maji

চড়াই উৎরাই ৩৬ (Trishna)

Rating: 5.0

চড়াই উৎরাই ৩৬ কার্গিল যুদ্ধ অবলম্বনে অরুণ মাজীর উপন্যাস
-------------------------------------------
ঘরটা আমিও ব্যবহার করি। কিন্তু তবুও এর নাম তৃষ্ণার ঘর। কেবল আজ নয়। বিগত কুড়ি বছর ধরে এর নাম, তৃষ্ণার ঘর। কাজেই, তাতে আমার আগমন ঘটলেও, এ ঘরের নাম 'তৃষ্ণার ঘর', তা কিন্তু মুছবে না।

ঘরে ঢুকেই দেখি, মেঝের এক কোণে আমার ব্যাগ রয়েছে। বুঝলাম, কোন এক ফাঁকে, কাকু ব্যাগটা এখানে রেখে গেছেন। ব্যাগ না খুলে, আলমারি খুললাম আমি। দেখি, আলমারির একদিকে তৃষ্ণার জামাকাপড়। আর অন্যদিকে আমার। সবকিছুই সুন্দর করে সাজানো।

এক সেট পাজামা পাঞ্জাবি আর গেঞ্জি নিয়ে আলমারি বন্ধ করলাম আমি। তারপর সেগুলো নিয়ে বাথরুমের মধ্যে ঢুকলাম। ঘরে ঢুকেই দেখি, দেওয়ালের উপরের দিকে বড় একটা সিলিন্ডার সাইজের ট্যাঙ্ক। বুঝলাম, এটাই হট ওয়াটার সিস্টেম।

 ট্যাঙ্কের বেশ নীচে দুটো ট্যাপ। একটাতে লেখা হট। অন্যটাতে কোল্ড। বুঝলাম, একটা হট ওয়াটারের জন্য। অন্যটা কোল্ড ওয়াটারের জন্য।

আসলে, হট ওয়াটার সিস্টেম আগে কখনো দেখি নি আমি। শুনেছি, এখানকার বড় বড় হোটেলে এই সিস্টেম রয়েছে। কিন্তু সেরকম কোন হোটেলে কখনো যাই নি আমি। কয়েকবার বেশ কিছু রেস্টুরেন্টে গেছি ঠিকই, কিন্তু কোনদিন কোন হোটেলে যাই নি। যাওয়ার দরকার হয় নি।

সিঙ্কের সমানে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজলাম আগে। তারপর শাওয়ারের মধ্যে ঢুকলাম। এনক্লোজারের মধ্যে ঢুকেই, হট ট্যাপটা খুললাম। মুহূর্তেই গরম জল পড়তে শুরু করলো। কিন্তু এ জল, বড্ড বেশি গরম। কাজেই কোল্ড ট্যাপটাও একসঙ্গে খুলে দিলাম আমি। তারপর জলের তাপমাত্রা এডজাস্ট করে স্নান করলাম আমি।

স্নান করে জামাকাপড় পড়ে ঘরে ফিরে এলাম আবার। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখি, আয়নায় এক প্রতিচ্ছবি। তৃষ্ণার আর আমার বিয়ের ছবির প্রতিচ্ছবি। পিছন ফিরে দেওয়ালের দিকে চেয়ে দেখলাম। দেখি, কনে সাজে  তৃষ্ণা। বর সাজে আমি। তৃষ্ণার চোখে কাজল, ঠোঁটে আগুন। আর পরণে, লাল বেনারসী। লাল ওড়না। আর সোনার মুকুট। আমার দিকে চেয়ে দুষ্টু হাসি হাসছে ও।

আর আমার পরণে বরের সাজ। নিতান্ত সাদামাটা পোশাক আমার। তৃষ্ণার সামনে বেশ অনুজ্জ্বল আমি। তবুও তৃষ্ণার দিকে অপলকে চেয়ে রয়েছি আমি।

বিয়ের আটদিন পরই কাশ্মীরে চলে গেছিলাম। তাই এ ছবি আগে আমি দেখি নি। ছবিটা দেখতেই, তৃষ্ণার কথা মনে পড়লো আমার।

তৃষ্ণা। আমার তৃষ্ণা। লাফিয়ে, খাটের উপর উঠলাম আমি। তারপর শুয়ে পাশ বালিশটা আঁকড়ে ধরলাম। এই পাশ বালিশের মধ্যে তৃষ্ণার ছোঁয়া আছে। কেন যেন এই পাশ বালিশকেই তৃষ্ণা মনে হলো আমার। পাশ বালিশটাকে জড়িয়ে, ছোট্ট একটা কিস করলাম আমি।

ভাবলাম,  অস্তিত্বেই কেবল অস্তিত্ব থাকে না। অনস্তিত্বের মধ্যেও অস্তিস্ত্ব থাকে। তৃষ্ণা, স্মৃতির মধ্যে ছবি হয়ে আছে। এ ঘরের বাতাসের মধ্যে সুগন্ধ হয়ে আছে। এ দেওয়ালের ছবির মধ্যে হাসি হয়ে আছে। এই বালিশের আবরণে একটু স্পর্শ হয়ে আছে। এই খাটের উপর আমার চির সঙ্গী হয়ে আছে।

তৃষ্ণা, কবে আসবে তুমি? কবে? কবে তোমার জ্যোৎস্না মুখের হাসি দেখবো আমি। কবে তোমার ঠোঁটদুটো ছুঁয়ে তোমার দিকে চেয়ে থাকবো আমি? কবে তোমার বুকের পাহাড়ে একটু স্বপ্ন আঁকবো আমি? কবে তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরবো আমি? কবে?
 
তোমার জন্য, পড়ি মরি করে এখানে পৌঁছে গেলাম আমি। অথচ তুমি কোথায়? কোথায়?

পাশ বালিশটাকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম আমি। তারপর পাশ বালিশে মুখ গুঁজে, শুয়ে থাকলাম আমি। মনে হলো, এই বালিশের মধ্যে তৃষ্ণার অনাবৃত বুকের সুগন্ধ রয়েছে।

এমন সময় নীচ থেকে কাকীমার গলার আওয়াজ ভেসে এলো-
'অমল, স্নান হয়েছে তোর? তৃষ্ণা অপেক্ষা করছে ফোনে।'

তৃষ্ণা! অপেক্ষা করছে ফোনে! সে কি, তৃষ্ণা অপেক্ষা করছে আমার জন্য?

এক লাফে বিছানা থেকে নামলাম আমি। তারপর প্রায় দৌড়ে, নীচে নামলাম আমি। দেখি, ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে, কাকীমা ফোনে কথা বলছেন। বুঝলাম তৃষ্ণার সঙ্গে কথা বলছেন উনি। আমি পৌঁছতেই, তৃষ্ণাকে উনি বললেন-
'এই নে, তোর বর এসে গেছে! '

হাসলাম আমি। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে বললাম-
হ্যালো..

কোন গৌরচন্দ্রিকা না করে তৃষ্ণা বললো-
'বর না ছাই তুমি! '

কেন? হলো কি?

'তুমি মেজর হয়ে গেছো, আমাকে জানাও নি? '

জানাবো কি করে? এখানে আসার মাত্র দুদিন আগে প্রমোশান পেলাম।

'কেন? ট্রেনে উঠার আগেরদিন তো চিঠি লিখলে আমাকে।'

আসলে কি জানো? লিখতে লজ্জা হচ্ছিলো!

'প্রমোশান পেয়ে লজ্জা হচ্ছে তোমার? তাহলে মানুষ খুন করলে কি হবে তোমার? '

কেন? মানুষ খুন করবো কেন আমি?

'করবে না তা জানি। কিন্তু তোমার লজ্জার কারণগুলো বড় অদ্ভুত! '

ভাবলাম, তুমি তো আসবেই। তাই তখনই বলবো তোমাকে।

'জানো, তুমি এখনো ক্যাবলাই রয়ে গেলে।'

ক্যাবলা হয়েই যদি তোমাকে পেয়েছি, তো নিজেকে বদলাবো কেন?

কথাটা বোধহয় কাকীমার কানে গেলো। উনি আমার উদ্দেশে বললেন-
আবার ক্যাবলা বলেছে তোকে? দে তো ফোনটা আমাকে।

আমি কিছু বলার আগেই, ফোনটা কেড়ে নিলেন কাকীমা। বললেন-
তুই কি রে? আবার ক্যাবলা বলেছিস অমলকে? আর্মির মেজর ও। আর ওকে তুই ক্যাবলা বলছিস?

তৃষ্ণা
'আমাদের কথার মধ্যে তুমি নাক গলাচ্ছো কেন মা? '

কাকীমা
'গলাবো না কেন? তুই ওকে যা তা বলবি, আর আমি তোকে ছেড়ে দেবো? '

তৃষ্ণা
'ও আমার, ওকে আমি যা খুশি তাই বলবো? '

কাকীমা
'মানে? '

তৃষ্ণা  
'ও আমার বর।'

কাকীমা
'সেটাই তো কথা। তোর বরকে তুই ক্যাবলা বলবি? এসব বাজে কথা, আমার বা তোর জেঠিমার মুখে শুনেছিস কখনো তুই? '

তৃষ্ণা
'তোমরা আলাদা যুগের। আমরা আলাদা যুগের। '

'আলাদা যুগের মানে? যুগের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সম্মানবোধ কমে নাকি? মানুষ বর্বর হয়ে উঠে নাকি? '

তৃষ্ণা এবার চুপ হয়ে গেলো। কাকীমা এবার দৃঢ় স্বরে বললেন-
'শোন তৃষ্ণা, তোকে আমি আল্টিমেটাম দিচ্ছি। কারও প্রতি কোন অসম্মানজনক কথা তোর মুখ থেকে শুনলে, তোকে ছেড়ে চলে যাবো আমি।'

ব্যাপারটা লঘু করতে মন গেলো আমার। কিন্তু পারলাম না। কাকীমা বেশ গম্ভীর আর দৃঢ়। জানি, এ অবস্থায় কিছু বলতে গেলে, আরও রেগে যাবেন কাকীমা।

কিছুক্ষণ চুপ রইলো তৃষ্ণা। তারপর ওর মাকে বললো-
'সরি, ভুল হয়ে গেছে মা।'

কাকীমা এবার একটু শান্ত হলেন। বললেন-
'আমরা জানি, তুই ওকে ভালোবেসে এসব বলিস। কিন্তু বাইরের লোক তা জানবে না। তারা তখন আমাদের বংশের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন করবে।'

তৃষ্ণা বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু তৃষ্ণা শুরু করার আগেই কাকীমা ওকে বললেন-
'নে, অমলের সাথে কথা বল তুই।'

ফোনটা আমার হাতে দিয়ে কাকীমা বললেন-
'ফোন নিয়ে উপরে যা। তারপর কথা শেষ হলে, নীচে নেমে আয়।'

চড়াই উৎরাই ৩৬ (Trishna)
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success