চড়াই উৎরাই ৭ক (Trishna) Poem by Arun Maji

চড়াই উৎরাই ৭ক (Trishna)

চড়াই উৎরাই ৭ক কার্গিল যুদ্ধ অবলম্বনে অরুণ মাজীর উপন্যাস
--------------------
জানো তৃষ্ণা?
আজ ইউনিটে ফিরতে পারি নি। কনভয় বন্ধ ছিলো।

তবে কি জানো? অলস দিনটা বেশ দারুন ভাবে কেটে গেলো! ভীষণ সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা হলো আজ। তুমি সাথে থাকলে, তোমারও ভালো লাগতো।

এক শিখ অফিসারের সাথে পরিচয় হলো এখানে। বেশ সিনিয়র অফিসার। একটা আর্টিলারি ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার। ভীষণ ভালো মানুষ উনি।

আমাকে উনি বৈষ্ণোদেবী মন্দিরে নিয়ে গেছিলেন। ভাবতে পারো, বৈষ্ণোদেবীর মন্দির? তুমিই বলো, উনি না থাকলে, ওখানে যাওয়ার কথা কখনো ভাবতে পারতাম আমি? প্রায় পৌনে দু কিলোমিটার উঁচু পাহাড়ের গুহায় এই মন্দির। ওখানে চড়ার জন্য, ঢালু আঁকা বাঁকা রাস্তা আছে। কিন্তু আমরা শর্ট কাট পথে চড়েছিলাম। শর্ট কাট পথটা একটা ওয়াকিং ট্র্যাক। বেশ খাড়া। বেশ বিপজ্জনক। কিন্তু সময় লাগে বেশ কম।

অবশ্য আমার কাছে এটা নতুন কিছু নয়। এর চেয়েও উঁচু পাহাড় প্রতিদিন উঠা নামা করি আমি। জানো? একদিন সুযোগ হলে, তোমাকেও নিয়ে যাবো সেখানে। ঊহঃ কি ভিড় মন্দিরে! মন্দিরের কাছাকাছি যখন পৌঁছলাম, তখন দেখি চারিদিকে কেবল মানুষের স্রোত। এমন দুর্গম পাহাড়ের উপর, এমন জনস্রোত! ভাবতে পারো তুমি?

মানুষ খুব অদ্ভুত! তাই না? এত কষ্ট করে, মানুষ দেব দেবী দর্শন করতে যায়। দেব দেবীর জন্য দীর্ঘ উপবাস করে তারা। দেব দেবীর জন্য কঠিন সাধনা করে তারা।

তবুও দুঃখ কি জানো? গরীব মানুষ, চিরকাল গরীব রয়ে যায়। দুর্বল মানুষ, চিরকাল অত্যাচারিত রয়ে যায়। এত দেব দেবী রয়েছেন; তো তারা সেই দুর্বল দরিদ্র নিপীড়িত মানুষগুলোকে একটু দেখতে পারেন না?

দেবতার বিরুদ্ধে অভোযোগ করছি না আমি। আমি কেবল, মানুষের দুঃখ যন্ত্রণা অসহায়তার কথা বলছি। দেবতারা যদি দরিদ্র আর দুর্বল মানুষকে দেখতেন, তো দুর্বল মানুষদের জীবন বড় সুন্দর হয়ে যেত। এই পৃথিবীটাও বড় সুন্দর হয়ে যেত। কিন্তু তা হচ্ছে কোথায়? দুর্বলরা আরও নিপীড়িত হচ্ছে। অনাথরা আরও অসহায় হচ্ছে।

তুমি তো জানো, ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে চাই আমি। কিন্তু যখন দেখি, দরিদ্র দুর্বল মানুষরা অনাহারে মরছে, বা সবল মানুষ দ্বারা তারা বারবার অত্যাচারিত হচ্ছে; তখন ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলি আমি। তখন ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাস জন্মে আমার।

এই বিশ্বাস আর বিশ্বাসের দ্বদ্বে ক্ষত বিক্ষত আমি। তুমি তো জানো, মা বা কাকীমার মত, অকুন্ঠ চিত্তে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে চাই আমি। কিন্তু পারি না। দরিদ্র দুর্বল মানুষদের চোখের জল, বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর মানুষের দৃশ্যমান চোখের জল যে দেখতে পায় না; সে অদৃশ্য ঈশ্বরকে দেখবে কি করে?  

কে জানে, হয়তো আমার বোধশক্তি দুর্বল। তাই পৃথিবীর মানুষের চোখের জল দেখতে পাই আমি। কিন্তু ঈশ্বরকে দেখতে পাই না।
তাই মানুষের কান্না শুনি আমি। কিন্তু অদৃশ্য দেবতার আহ্বান শুনি না।
তাই পথের শিশুকে আমার পূজ্য ঈশ্বর মানি আমি। কিন্তু অদৃশ্য দেবতাকে ঈশ্বর মানতে পারি না।

জানো, রাতের খাবার খেয়ে ঘরে ফিরলাম যখন, কিছুই ভালো লাগছিলো না তখন। কেবল তোমার কথা মনে পড়ছে। ঠাম্মা মা কাকীমা দিদি, সবার কথা মনে পড়ছে। আমি খুব হোম সিক! তাই না? তিনদিন হলো তোমাদেরকে ছেড়ে এসেছি, কিন্তু এখনই মনে হচ্ছে কতদিন দেখি নি তোমাদেরকে। বিশেষ করে, তোমাকে বেশ মনে পড়ছে। তোমার কাজল চোখ দুটো মনে পড়ছে। তোমার টোল ফেলা গালের দোল তুলা হাসির কথা মনে পড়ছে। তোমার সুন্দর টকটকে লাল ঠোঁট দুটোর কথা মনে পড়ছে।

একটু ছুঁয়ে দেবে তুমি? একটু? দাও না গো! তিনদিন কোন ছোঁয়া পাই নি তোমার। এই চোখ বন্ধ করলাম আমি। আমার স্বপ্নে এসে, এখুনি ছুঁয়ে দাও আমাকে। গুটি গুটি পায়ে চুপিচুপি এসে, পিছন থেকে জড়িয়ে ধরো আমাকে। তারপর আমার পিঠের উপর তোমার নরম বুক ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করো-
'আমি কে বলো তো? '

আমি বলবো-
নাহঃ বুঝতে পারছি না। বুক দিয়ে আরও একটু জোরে চেপে ধরো আমাকে। তাহলে বুঝতে পারবো।

তুমি তখন আরও জোরে চেপে ধরবে আমাকে। তোমার বুকের উষ্ণতা, আমার রক্তে পৌঁছে যাবে তখন। আমার রক্ত  উন্মাদ উন্মত্ত হয়ে উঠবে। আমার হৃস্পন্দন, অশ্বক্ষুরের মত টগবগ করে দৌড়তে থাকবে। তখন তোমাকে আমি বলবো-
নাহঃ এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না।

তুমি তখন আমার সামনে এসে, আমার ঠোঁট স্পর্শ করে বলবে-
'বেশ, এবার চিনতে পারছো? '

তোমার উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটবে আমার দেহে। তখন চোখ বন্ধ করবো আমি। আর অস্ফুট স্বরে বলবো-
তোমাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। কে তুমি?

তুমি তখন বুকে জড়িয়ে ধরবে আমাকে। তারপর তোমার কোমল বুকের স্পর্শে, ঘুমের বুকে ঢলে পড়বো আমি।

আচ্ছা, স্বপ্ন কেন বাস্তব হয় না বলো তো? তাহলে, স্বপ্নের মধ্যেই, তোমাকে সত্যিকারের পেতাম আমি। স্বপ্নের মধ্যেই তোমাকে ছুঁয়ে, আমার ইচ্ছেকে খুশি করতাম আমি।

তুমি ভালো থেকো। ইউনিটে পৌঁছেই, তোমাকে ফোন করবো আমি।

ইতি
অমল  

© অরুণ মাজী

চড়াই উৎরাই ৭ক (Trishna)
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success