নারী ব্যতীত সৃষ্টি সম্ভব নয়। সৃষ্টি যদি বা ঘটেও যায়, নারী ব্যতীত তার পালন বা ধারণ কখনো সম্ভব নয়।
ধরো, পৃথিবীতে কেবলই পুরুষ! কতদিন বাঁচবে তারা? সৃষ্টির যা কিছু সুন্দর, সে সব কিছুই মানুষকে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করে। জীবনে তো এতো দুঃখ কষ্ট আর যন্ত্রণা! তা সত্বেও মানুষ বাঁচতে চায় কেন? তার কারন- পৃথিবীর মধ্যে যে সৌন্দর্য্য আছে, তা মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। পৃথিবীতে যেদিন সৌন্দর্য্যের অবলুপ্তি ঘটবে, সেদিন মানুষও তার বাঁচার তাগিদ হারাবে। তখন মনুষ্য জাতিরও অবলুপ্তি ঘটবে।
সৌন্দর্য্যসুখ না থাকলে, তুমি জীবনের কয়েকদিনের মধ্যেই আত্মহত্যা করতে। ভাবো তো, আমাদেরকে কে দেয় সেই সৌন্দর্য্য? নারী।
নদী নারী।
প্রকৃতি নারী।
মাতৃ ক্রোড় নারী।
তোমার রাতের স্বপ্ন, সেও নারী।
ক্লান্ত শরীরে তোমার রাতের আশ্রয়, সেও নারী।
পেন্টিংয়ে এতো নারী কেন? কবিতায় এতো নারী কেন? চলচিত্রে এতো নারী কেন? বিজ্ঞাপনে এতো নারী কেন? আমার লেখায় এতো- মালবিকা কেন? তিন্নি কেন? পেন্তীর মা কেন? বৃন্দাবনী কেন? কারন- নারী বক্ষেই সৌন্দর্য্যের জন্ম। সকলেই চাই- নারীর সৌন্দর্য ধার করে, তাদের সৃষ্টিকে আরও সুন্দর করতে। ঈশ্বরও চেয়েছেন- তার সৃষ্টিকে নারী দিয়ে সুন্দর করতে। তাই তিনি মানবী গড়েছেন। নদী গড়েছেন। প্রকৃতি গড়েছেন।
নারী বিনা ঈশ্বরও সুন্দর নয়। নারী বিনা কবিতা সুন্দর নয়। নারী বিনা কবি হৃদয় সুন্দর নয়। তোমরা কে কি ভাবো জানি না। আমি কিন্তু বলতে পারি, আমার প্রতিমুহূর্তের প্রেরণা, শক্তি, পাথেয় সব কিছুর উৎস নারীবক্ষ। আমার রক্ত আমার মায়ের থেকে। আমার প্রথম পুষ্টি আমার মায়ের থেকে। আমার প্রথম আশ্রয় সেও আমার মা। জীবনে এতো পরিশ্রম করেছি, সেও কোন এক নারীকে একটু খুশি করবো বলে। নারীর অবদান ছাড়া, আমি আমার জীবনের একটা মুহূর্তকেও কল্পনা করতে পারি না।
আমি নারী দিয়ে তৈরী। আমার স্বপ্ন নারী দিয়ে তৈরী। আমার কর্ম্ম নারী দিয়ে তৈরী। আমার ত্যাগ নারী দিয়ে তৈরী। আমার স্বপ্ন কর্ম্ম ত্যাগ- সব কিছুর উৎস নারী।
আমার অস্তিত্বের প্রতি কণা যেখানে নারীর করুণা দিয়ে তৈরী, সেখানে নারীকে ঈশ্বররূপে পূজা করা ছাড়া, আমার অন্য কোন উপায় আছে কি? ব্যক্তিগত ভাবে, আমি নারীকে ঈশ্বর ছাড়া আর অন্য কোন আসন দিতে পারি না।
ভারত আজ অরাজকতা পূর্ণ। কিন্তু প্রাচীন ভারতবর্ষ ছিলো পৃথিবীর শক্তি কেন্দ্র। সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় পন্ডিত ভারতে শিক্ষালাভ করতে আসতো। আর্যভট্ট কেবল চিন্তা শক্তি ব্যবহার করে, নক্ষত্রের কাঁধে কাঁধ রেখে, হুঁকো টানতে টানতে, আকাশ পথে হাঁটতেন। মানব জাতির ইতিহাসে, একমাত্র আইনস্টাইন ছাড়া, এই অসম্ভব ক্ষমতা আর কারও মধ্যে নেই। (আইনস্টাইন, পেন্সিল দিয়ে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে আলোর গতিবেগ মেপেছিলেন।)
আর্যভট্টের সেই ভারত আজ নরক কেন? বৌধায়ন, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য্য, বরাহমিহির, নাগার্জুন, কণাদ, সুশ্রুত, চরক- প্রমুখের ভারতবর্ষ আজ এতো আঁধারগ্রস্ত কেন? কেন?
যেদিন থেকে ভারতবর্ষ নারী জাতিকে অশ্রদ্ধা করতে শিখেছে, সেদিন থেকে ভারতবর্ষ নরকে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। প্রাচীন ভারতবর্ষে নারী পুরুষের চেয়ে এক কণা কম ছিলো না। গার্গী বাচকনভি দর্শন বিতর্কেমহর্ষির যাজ্ঞবল্ক্যের কাঁছা খুলে তাতে কাঠ পিঁপড়ে ছেড়ে দিতেন। গার্গী ছিলেন- ভয়ঙ্কর এক দার্শনিক, বেদ বিশেষজ্ঞ, ব্রহ্ম বিদ্যা বিশেষজ্ঞ (ব্রহ্ম বিদ্যা = KNOWLEDGE OF UNIVERSE) । তিনি মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের সাথে "NATURE OF REALITY" নিয়ে যে বিতর্ক করেছিলেন, তা আজকের দিনের কোয়ান্টাম ফিজিক্সের বিতর্ককে ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে। তিনি ছিলেন অবিবাহিতা। ভাবো, একজন প্রাচীন ভারতীয় নারী- দেহাতি শাড়ি আর আলতা পরে, সারাজীবন নিজ ইচ্ছেয় অবিবাহিতা থেকে, দেশ দেশান্তরে ঘুরে ঘুরে, সারা পৃথিবীর পন্ডিতদের কাঁছা, এক এক করে টেনে, তাদেরকে গুনে গুনে উলঙ্গ করছে! ভাবো গো ভাবো।
মৈত্রেয়ী ছিলেন বেদ বিশেষজ্ঞ, ব্রহ্ম বিদ্যা বিশেষজ্ঞ। তিনি ছিলেন- অদ্বৈত্যবাদী। আত্মা পরমাত্মার অংশ। অদ্বৈত্যবাদও হলো- আজকের দিনের কোয়ান্টাম ফিজিক্স। এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সব কিছু কেমনভাবে পরস্পর সংযুক্ত, অদ্বৈত্যবাদ দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যায়। বিজ্ঞানীরা আগে তা বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু আজকের দিনের সবচেয়ে আলোচিত STRING THEORY বেদেরঅদ্বৈত্যবাদকেই মান্যতা দেবে।
আর আজকের আধুনিক ভারতবর্ষ? কন্যা ভ্রূণকে হত্যা করে। বৃদ্ধা নারীকে, ডাইনি অপবাদে নৃশংস ভাবে কুপিয়ে খুন করে। বিয়েতে পণ পায় নি বলে, স্ত্রীর গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে, তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে। আজকের ভারতবর্ষে- একদল মানুষ গোমূত্র খেয়ে স্বর্গে যেতে চাইছে, আর একদল মানুষ শিশু আর নারী খুন করে বেহেস্তে যেতে চাইছে।
হাজার হাজার বছর আগে, আমাদের পূর্বপুরুষ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সমাজ তত্ত্ব, অর্থিনীতি আর রাজনীতি জানতেন (তারা সত্যিকারের জানতেন। আজকের দিনের মতো "ফোর টোয়েন্টি পন্ডিতদের" মতো নয়। আজকের দিনে কে কার কবিতা চুরি করছে। কে কার গবেষণা চুরি করছে। কে বন্দুকের নল দেখিয়ে, গলায় ডি লিট উপাধি ঝুলাচ্ছে ইত্যাদি) । হাজার হাজার বছর আগে, আমাদের পূর্বপুরুষরা বুঝতে পেরেছিলেন- নারী জাতিকে মাথার উপরে স্থান না দিলে, কোন দেশ বা কোন জাতির উত্তরণ সম্ভব নয়। তাই তারা ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরকে উপেক্ষা করে, দেবী দূর্গাকে দুর্গতিনাশিনী সর্ব্ব শক্তিদায়িনী করেছিলেন।
একে বলে ভবিষ্যৎদৃষ্টি। একে বলে দর্শন চিন্তা। খাচ্ছে তারা বটুর দোকানে চা। কিন্তু হাঁটছে তারা কোটি কোটি মাইল দূরে থাকা বৃহস্পতির সাথে তালে তাল মিলিয়ে। কেবল হাঁটছে না, তারা হুঁকো টানতে টানতে হাঁটছে।
কিন্তু আজকের দিনে কি ঘটছে? ধরো, কোন এক মহিলা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য। তাকে পাড়ার এক দাদা গিয়ে বললো- "এই শালী, আমাকে তুই ডি লিট দে। নইলে- আমি তোর মেয়ের শোয়ার ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেবো।"
প্রাচীন ভারতবর্ষ তাদের সময়ের চেয়ে ১০ হাজার বছর এগিয়েছিলো। আর আজকের আধুনিক ভারতবর্ষ, মঙ্গলগ্রহ যাত্রার যুগে বাস করে, এক লক্ষ বছর পিছিয়ে আছে। এখনো এরা নারীকে ঘোমটা আর বোরখার আড়ালে ঢেকে রাখে। কন্যা ভ্রূণকে গর্ভে হত্যা করে। বাড়ির বৌকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে। অসহায় পরিত্যক্ত বৃদ্ধা নারীকে ডাইনি বলে কুপিয়ে খুন করে। নারী ধর্ষিত হলে রাজ্যের মুখ্যন্ত্রীগণ বানেতারা কি বলেন? "এ সব তো সাজানো ঘটনা" অথবা "ছুঁড়ীর বড় বাই উঠেছে। ছুঁড়ী তাই মিনি স্কার্ট পরে পথ হাঁটছে "।
হে ঈশ্বর, কত যন্ত্রণা দেখবো গো, আর কত যন্ত্রণা দেখবো। ইচ্ছে তো করে- দেশের এই সব নেতা পন্ডিত আর ধর্মগুরুদের মুখে এখুনি আমি শুঁশু করে দিই। কিন্তু আমি তা পারি না!হে ঈশ্বর, এ পোড়াকপালে কেন মুখ-লজ্জা দিলে আমায়?
পৃথিবীর সমগ্র নারীকে অরুণ মাজীর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম।
যা দেবী সর্বভূতেষু স্মৃতিরূপেণ সংস্থিতা | নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ||
যা দেবী সর্বভূতেষু দয়ারূপেণ সংস্থিতা | নমস্তস্যৈনমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ||
যা দেবী সর্বভূতেষু তুষ্টিরূপেণ সংস্থিতা | নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈনমস্তস্যৈ নমো নমঃ ||
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা | নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈনমস্তস্যৈ নমো নমঃ ||
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem