'ক্রিং ক্রিং ক্রিং'
ফোনের শব্দে ঘুম হটাৎ ভাঙলো আমার। বেশ বিরক্তই হলাম। ভাবলাম, ঊহঃ এ আবার কোন আপদ। ঘুমের ঘোরে, ফোনটা পাশের টেবিল থেকে উঠলাম। ফোনটা হাতে নিতেই দেখি অমল। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। ঘুম একপ্রকার ছুটে গেলো আমার। অমল? এ সময়ে? এতো সকালে কখনো তো ফোন করে নি ও। বেশ উদ্বেগের সুরে বললাম-
'তুমি? কি ব্যাপার? '
'কি গো, এখনো উঠো নি? '
অমলের প্রশ্ন শুনে চমকে উঠলাম আমি। বললাম-
উঠবো? কেন? এতো তাড়াতাড়ি উঠবো কেন?
'সে কি গো? তোমাদের তো আজ সকাল থেকে, জিমে যাওয়ার কথা।'
জিম! ঊহঃ ভুলেই গেছিলাম আমি। বললাম-
কথা তো ছিলো। কিন্তু মা বা বাবা, কেউই তো এখনো ডাকে নি আমায়!
'ওনারা বয়স্ক। ওনারা তোমাকে ডাকবে? না তুমি ওনাদেরকে ডাকবে? '
ভাবলাম, তাই তো! অমলই ঠিক। আমি ইয়ং। তাই আমারই উচিত মা বাবাকে জাগিয়ে দেওয়া। কোন উত্তর করার আগেই অমল বললো-
জানো? তোমাকে ফোন করে, আমিও দৌড়তে যাচ্ছি।
হেসে বললাম-
তাই? বেশ, যাও।
'হুঁ। তোমরাও এখুনি বেরিয়ে পড়ো।'
অমল ফোনটা কেটে দিলো। ফোনের ঘড়িতে, সময় দেখলাম। সকাল ছটা দশ।
ভেবেছিলাম, আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু অমলও দৌড়তে যাচ্ছে শুনে, নিজের মধ্যে এক তেজ জেগে উঠলো। নিজেকেও উদ্দীপ্ত মনে হলো যেন। এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। আমার ঘর ছেড়ে নীচে নেমে এলাম আমি। তারপর মায়ের ঘরের দরজার কড়া নেড়ে বললাম-
মা... ও মা.....
বাবা ঘুম জড়ানো গলায় বললো-
'কিরে? এতো সকালে হলো কি? '
তোমরা যে বললে, জিমে যাবে সকালে?
গলার স্বর শুনে বুঝতে পারলাম, বাবা প্রায় লাফিয়ে উঠলো। বললো-
'তাই তো। বেশ করেছিস ডেকে দিয়েছিস।'
তোমরা রেডি হয়ে নাও। আমিও পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে আসছি।
কথাগুলো বলে, উপরে উঠে এলাম। বেশ কয়েক বছর আগে, নাচ প্র্যাক্টিস করবো বলে, সুঁতির ট্র্যাক প্যান্ট আর টি শার্ট কিনেছিলাম আমি। আলমারি থেকে সেগুলো বের করে, বাথরুমে গেলাম। মুখ হাত ধুয়ে, ড্রেস পরে, পাঁচ মিনিটে তৈরী হয়ে নিলাম। তারপর বেশ দ্রুত পায়ে নীচে নেমে এলাম।
নীচে নেমে দেখি, বাবা তখন জুতো পরছে। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম-
মা কোথায় বাবা?
'তোর মা রান্না ঘরে। চা বানাচ্ছে।'
রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলাম আমি। রান্না ঘরে ঢুকতেই, মা আমার দিকে চেয়ে, বেশ খুশির হাসি হাসলো। আমিও হাসলাম। মাকে বললাম-
চা বরং আমি রেডি করছি। তুমি ততক্ষণে তৈরী হয়ে নাও।
মা একটু এগোতেই, মাকে আমি বললাম-
এখন আর শাড়ি পরো না। চুড়িদার পরে নাও।
খুব দ্রুত চা পান করে রাস্তায় নেমে এলাম আমরা। সময় এখন সাড়ে ছটা। রাস্তায় নেমেই মা বললো-
ঊহঃ কি ভালো লাগছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম-
কেন?
মা-
কত বছর ভালো করে সকালের পৃথিবীকে দেখি নি।
মনে মনে ভাবলাম, কেবল আমরা নই। কলকাতার বেশিরভাগ মানুষই, অনেকদিন ভালো করে সকালের পৃথিবীকে দেখে নি। বদ্ধ জীবন। আবদ্ধ মন। লুপ্ত তাদের জীবনের উচ্ছ্বাস।
ভাগ্যিস, দেরী হলেও, আমার অন্তত আজ তা শুরু করতে পেরেছি। কোন কাজের শুরুই সবচেয়ে কঠিন। মনের সহস্র প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হয়। অজুহাত প্রিয় মনকে উদ্দীপ্ত করতে হয়। বাবা আমার দিকে চেয়ে হাসলো। বললো-
বেশ ভালো লাগছে, তাই না প্রীতি?
আমি কিছু বলার আগেই, হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় নাড়লো মা। আমি সামনে। মা মাঝখানে। বাবা এক্কেবারে পিছনে। পিছন ফিরে দেখি, মায়ের দিকে চেয়ে হাসলো বাবা।
আমাদের পাড়ার রাস্তা এখনো বেশ ফাঁকা। রাস্তাতে কেবল, ছোট ছোট কিছু মালবাহী গাড়ি। কিছু রিক্সা। কিছু সব্জি সকালের ব্যবসায়ী। কিছু শ্রমিক। আর কিছু উদ্দীপ্ত মানুষ। কলকাতার মানুষ রাতে বেশ জেগে থাকে। কিন্তু সকালে উঠতে, তারা খুব বেশি অভ্যস্ত নয়।
ঠান্ডার ভাব এখনো যায় নি। বাড়ির থেকে বেরিয়ে তা টের পেয়েছি। কিন্তু এখন আর ঠান্ডা লাগছে না। হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে, বেশ উষ্ণ বোধ করছি নিজেকে। আগে আগে হাটছি আমি। দৌড়োচ্ছি আমি। মাঝে মাঝে বেশ একটু এগিয়ে গিয়ে, আবার মা বাবার জন্য, পিছনে ফিরে আসছি।
বেশ উদ্দীপ্ত লাগলো নিজেকে। বাবার দিকে চেয়ে বললাম-
জানো বাবা? আজ বরং পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে আসি আমরা। ফেরার পথে, জিমে গিয়ে মেম্বারশিপ ঠিক করে আসবো।
বাবা উত্তর করার আগেই, মায়ের দিকে চেয়ে দেখলাম আমি। দেখলাম, মা বেশ ঘামছে। মাকে উৎসাহ দিতে বললাম-
তুমি তো বেশ ভালো গতিতেই হাঁটছো মা।
হাঁফাতে হাঁফাতে মা হাসলো। মাকে বললাম-
আমাদের পাড়ার আশপাশের সব রাস্তাগুলো চক্কর দেবো আজ।
সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লো মা। বয়স একটু হলেও, মা খুব শক্ত প্রকৃতির। মা কোন কাজেই, এতো সহজে হাল ছাড়ে না।
হাল ছাড়বে কেন? প্রথম প্রথম কিছুদিন কষ্ট হবে ঠিকই। কিন্তু তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। সব কিছুরই অভ্যাস দরকার।
মা বাবাকে পিছনে ফেলে, আবার সামনের দিকে দৌড় শুরু করলাম আমি। একটু এগোতেই দেখি, এক বৃদ্ধা গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে। আড়চোখে ওনার দিকে চেয়ে খুশির হাসি হাসলাম আমি। উনি বোধহয় আমার হাসিতে উৎসাহিত হলেন। উনিও আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। আমার দিকে এক পলক নজর করেই উনি জিজ্ঞেস করলেন-
'তুই ধৃতির মেয়ে? '
চমকে উঠলাম আমি। থেমে, জিজ্ঞেস করলাম-
আমার মাকে জানেন আপনি?
'জানবো না মানে? ধৃতি তো আমার স্টুডেন্ট।'
আপনিও ছাত্র পড়াতেন?
'গোখেল গার্লসের প্রিন্সিপ্যাল ছিলাম আমি।'
তাই? মা-ও আসছে পিছনে।
'তাই নাকি? বেশ, আজ দেখা হবে তাহলে।'
হ্যাঁ, বাবাও।
'বাহঃ। কিন্তু তোকে তো আগে কখনো দেখি নি সকালে? '
নাহঃ আগে কখনো আসি নি। আজই শুরু করেছি।
'বেশ করেছিস। পঞ্চাশ বছর হলো, এ রাস্তায় প্রতিদিন হাঁটি আমি।'
চমকে উঠলাম আমি। বললাম-
পঞ্চাশ বছর?
'হ্যাঁ। দেবুর বাবা যখন বেঁচে ছিলো, তখন আমরা দুজন হাঁটতাম এই রাস্তায়।'
কথাটা বলেই বেশ দমে গেলেন উনি। চোখ মেলে আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন উনি। যেন আকাশ পানে চেয়ে কাউকে খুঁজতে চেষ্টা করলেন। দেখলাম, চোখটা ছল ছল করছে ওনার। ওনার ডান হাতটা আলতো করে ধরে বললাম-
আপনি খুব শক্ত মানুষ। You inspire us.
নিজেকে সামলে নিয়ে, উনি আকাশের দিকে চেয়ে বললেন-
'সূর্যকে দেখতে পাচ্ছিস? '
আমি বললাম-
হ্যাঁ।
'প্রতিদিন, সকালের সূর্যকে দেখবি। শক্তি পাবি তুই। প্রতিদিন, সকালের বাতাসকে গ্রহণ করবি। প্রাণ পাবি তুই।'
চোখ বুজে গভীর এক শ্বাস নিলাম আমি। নিজেকে বেশ শীতল মনে হলো আমার। সবুজ মনে হলো আমার।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem