জানো, ভালোবাসা সবার কপালে জোটে না।
ভালোবাসা পাওয়ার কপাল থাকতে হয় গো, কপাল থাকতে হয়। নিজে ভালো হলে, ভালোবাসা নিশ্চয় হয়তো পাওয়া যায়। কিন্তু প্রাপ্য সেই ভালোবাসা নিছক কর্তব্যের ভালোবাসা। এমন ভালোবাসার কথা আমি বলছি না।
আমি বলছি- কুড়িয়ে পাওয়া ভালোবাসার কথা। ভালোবাসা পাওয়ার হয়তো কোন গুণই নেই আমার। তবুও কপালের গুণ আমার এতো বেশি, তাতেও- কোন একজন মানুষ, আমাকে গভীর ভালোবাসবে। আমি মূর্খ, আনাড়ি, চরিত্রহীন লম্পট, তবুও আমাকে কেউ ভালোবাসবে। এমন বড় এক হৃদয়ের, অকৃপণ নিঃস্বার্থ কুণ্ঠাহীন বিচারহীন ভালোবাসার কথা বলছি আমি।
ছেলে যদি উচ্ছন্নেও যায়, মা তবুও তাকে ভালোবাসে। মানুষ নদীকে বিষ পান করায়, নদী তবুও মানুষকে ভালোবাসে। মানুষ ধরিত্রীকে নির্মম কষ্ট দেয়, তবুও ধরিত্রী মানুষকে ভালোবাসে। এমন ধরণের দ্বিধাহীন কুণ্ঠাহীন বিচারহীন ভালোবাসার কথা বলছি আমি।
সবাই আমরা সমান হতভাগ্য। সবাই আমরা সমান কাঙাল। সবাই আমরা একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, যন্ত্রণায় ছটফট করছি। সবাই আমরা ঘরের মধ্যে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছি। সবাই আমরা ঈশ্বরের কাছে ভালোবাসা ভিক্ষা করছি। সবাই আমরা ঈশ্বরের কাছে নালিশ করছি- "হে ঈশ্বর, এতো নির্মম কেন তুমি? একটু ভালোবাসবে, এমন কাউকে তুমি দিলে না? " "হে ঈশ্বর, কি পাপ করেছি আমি, তোমার চরণে? "
আমরা যত বড় হচ্ছি, বাবা মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সেই শূণ্যতা- বুকের মধ্যে আরও তীব্র অনুভব করছি। ছলছল চোখে আমাদের- মায়ের মুখ মনে পড়ে, বাবার মুখ মনে পড়ে, ঠাম্মার মুখ মনে পড়ে। মনে পড়ে দাদা দিদি, কাকা কাকী, দাদু ঠাম্মার কথা। আমাদের সুন্দর সেই পৃথিবী, কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। আজ আমাদের মনে পড়ে কেবল- তুলসী তলার সাঁঝের প্রদীপ, আর কদম তলার মায়াবী সুগন্ধ।
আমি ভালো করে জানি- অরুণ মাজী বেঁচে নেই। তোমরা যাকে দেখো বা পড়ো, সে হলো অরুণ মাজীর এক কঙ্কাল। অরুণ মাজী কেবল, তার অতীতের সুগন্ধগুলোকে, তোমাদের কাছে ফেরি করছে। অরুণ মাজী মৃত। সে শ্মশানের মাটিতে মিশে গেছে।
আমি যখন দু বছরের, আমি মাকে হারিয়েছি। মায়ের মুখটাও আমার মনে পড়ে না। আমি আমার বিমাতার কোলে মানুষ। আমি আমার ঠাকুরদাকে চোখে দেখি নি। মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময়, আমি আমার ঠাম্মাকে হারিয়েছি। বিদেশে আসার পর, আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি। আমার আর রইলো কি? আমার কিছু নেই। সব শেষ। আমি মৃত। তোমাদেরকে আমি যা দিই, তা হলো- মাতৃগর্ভে পাওয়া, আমার মায়ের আত্মত্যাগী ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা, আজও আমি বুকে নিয়ে ঘুড়ছি।
সবই হারিয়ে গেছে গো, সবই হারিয়ে গেছে। এখন কেবল বাইরেই আমরা- চুনকালি আর স্নো পাউডার মেখে, হাসি হাসি মুখে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু অন্তরে আমরা, শ্মশানের চিতার মতো দাউ দাউ করে পুড়ছি। আমরা এমন ভীরু- আমাদের অন্তরের সেই গভীর যন্ত্রণার কথা, কাউকেই- মুখ ফুটে বলতে পারি না। আমরা তাই-
হাসি দিয়ে কান্না ঢাকি।
আঁচল দিয়ে বুকের ক্ষত ঢাকি।
আতরের সুগন্ধ দিয়ে আমাদের মৃত আত্মার দুর্গন্ধ ঢাকি।
তবুও আমরা বেঁচে আছি। তুমিও আছো, আমিও আছি। তুমিও লড়ছো। আমিও লড়ছি। আমরা সবাই বুক চিতিয়ে লড়ছি গো, আমরা সবাই বুক চিতিয়ে লড়ছি।
কাঁদছি বলে কি, হাসবো না?
ভালোবাসা পাই নি বলে কি, ভালোবাসা দেবো না?
মরবো বলে কি, বাঁচার জন্য লড়বো না?
আলবৎ লড়বো। হাজারবার লড়বো। বুকে তুড়ি মেরে লড়বো। আমরা কাঁদতে কাঁদতে হাসবো, হাসতে হাসতে কাদঁবো। আমরা মরতে মরতে বাঁচবো, বাঁচতে বাঁচতে মরবো। দেখো, ঈশ্বর দেখো। রক্ত মাংসের সামান্য মানুষ হতে পারি আমরা। কিন্তু এ বাঁচার লড়াই আমরা ছাড়বো না।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem
keno je unmad kore den..... bar bar sudhu prem e pore jai apnar likhar...