উত্তরণ, অরুণ মাজীর উপন্যাস
যারা দূরে সরে যায়, তারা সত্যিই কি দূরে সরে যায়? অথবা বুকের নিঃশব্দ নিঃসঙ্গ এক কোণে, ক্ষণিকের তরে লুকিয়ে যায়?
যারা দূরে সরে যায়
মনের অজান্তে তারাগোপনে বুকের কোণে লুকিয়ে যায়।
একদিন ভেবেছিলাম জীবনের অনেক কিছুই হয়তো, দূরে সরে গেছে আমার। গ্রাম দূরে সরে গেছে। শৈশব দূরে সরে গেছে। স্মৃতি দূরে সরে গেছে। মানুষ দূরে সরে গেছে। কিন্তু জীবনের যাত্রাপথে হেঁটে বুঝতে পেরেছি, নাহঃ দূরে সরে যায় নি তারা। ক্ষণিকের তরে লুকিয়ে গেছে কেবল। খুঁজলেই পাওয়া যায় তাদেরকে। চাইলেই পাওয়া যায় তাদেরকে।
কারণ- মাঝে মাঝেই, আমার চেতনায় জেগে উঠে তারা। স্বপ্নে জেগে উঠে তারা। অস্তিত্বে জেগে উঠে তারা।
আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমার মাস্টারমশাই। আমার পাড়ার বৃন্দাবনী। ঘোষ পুকুরের শালুক আর কচুরিপানা। শ্মশান পাড়ের গাব আর কদবেল গাছ। পেন্তী বুড়ির হুঁকো। ছোট কাকার সাথে মাছ ধরা। আমাদের বাড়ির পিছনের চাঁপা গাছ। এরা সবাই জেগে উঠে আবার। কখনো স্মৃতিতে। কখনো কল্পনায়। কখনো স্বপ্নে। কখনো বা আমার কর্মে।
নাহঃ বাবাকে মনে পড়ে না আমার। যখন খুব ছোট ছিলাম আমি, বাবাকে হারাই আমি। মা-ই আমাকে মাতৃ স্নেহের সাথে, পিতৃ স্নেহে মানুষ করেছে। মা-ই আমার বাবা। মা-ই আমার মা। মা-ই আমার পৃথিবী। মা-ই আমার স্বর্গ। মা-ই আমার ঈশ্বর। মা ভিন্ন কোন জগৎ নেই আমার। কোন ঈশ্বর নেই আমার।
তবুও যেন কখনো কখনো মনে হয়, বাবাকে দেখেছি আমি। বাবার হাতের উষ্ণ স্পর্শ, অনুভব করেছি আমি। বাবার বুকে শুয়ে, কতবার যেন ঘুমিয়ে পড়েছি আমি। বাবার বুকে চড়ে, কত খেলা খেলেছি আমি। তার হাত ধরে গাঁয়ের কত পথ পরিভ্রমণ করেছি আমি। হয়তো সে সব পরিষ্কার মনে নেই। কিন্তু আবছা আবছা মনে পড়ে আমার।
মনে পড়লেই হলো। একটু একটু তো কি? আবছা আবছা আর পরিষ্কারের মধ্যে তফাৎ কতটুকু? পরিষ্কারের চেয়ে বরং, আবছা আবছাই ভালো। আবছা আবছা হলে, তা আমাকে, আরও বেশি ভাবতে বাধ্য করে। আমাকে আরও বেশি সংবেদনশীল হতে বাধ্য করে। কুহেলিকার এমন অদ্ভুত এক আকর্ষণ আছে, যা স্বচ্ছতার নেই।
জানো? তৃষ্ণা চলে গেলো। জিজ্ঞেস করছো, তৃষ্ণা কে? সে কি গো? তৃষ্ণাকে জানো না তোমরা। শ্যামল বরণ সেই মেয়েটা গো।
জানো? ও এখন অস্ট্রেলিয়াতে পড়তে গেছে। খুব জেদী আর পাঁজি কিনা। তাই আমাকে ছেড়ে, অস্ট্রেলিয়াতে পড়তে গেছে।
আর আমি? আমি আর কি করবো? আমি সকালে উঠি 'তৃষ্ণা' বলে। ঘুমিয়ে পড়ি, সেও 'তৃষ্ণা' বলে। তৃষ্ণা আমার ধ্যান। তৃষ্ণা আমার জ্ঞান। তৃষ্ণা আমার ধর্ম। তৃষ্ণা আমার কর্ম।
তৃষ্ণা তৃষ্ণা আর তৃষ্ণা। তৃষ্ণা নামে তৃষ্ণার্ত আমি। তৃষ্ণা নামে, বুকে জাগে ব্যথা, চোখে আসে জল। ও আমার স্বপ্নে আসে, কর্মে হাসে। আমার পৃথিবী তৃষ্ণা, অস্তিত্ব তৃষ্ণা।
জানো? ও আজ আর কাছে নেই আমার। আমি তাই পৃথিবী শূন্য। আমি তাই 'আমি' শূন্য।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem