আজ যা কিছু ভালো মনে করে তুমি চাও, কাল- তার জন্য তুমি অনুতাপ করো।
আজ যা কিছু খারাপ মনে করে তুমি দূরে ঠেলে দাও, তারও জন্য কাল তুমি অনুতাপ করো।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের সবার হয়। তাই না? এই ঘটনা কি প্রমাণ করে?
১. ভালো খারাপের সংজ্ঞা, সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে।
২. আমাদের বিচার ত্রুটিমুক্ত নয়। আমরা ভুল বিচার করি।
ভালো খারাপের সংজ্ঞা, কে তৈরী করেছে? মানুষ। এই বিশ্বে যা কিছু বর্তমান, তাদের সবারই কোন না কোন একটা উদ্দেশ্য আছে। মানুষ তার প্রয়োজনে সৃষ্টির বিভিন্ন জিনিসকে "দিন রাত" নাম দিয়েছে। "আলো অন্ধকার" নাম দিয়েছে। "সুখ দুঃখ" নাম দিয়েছে। "ভালো খারাপ" নাম দিয়েছে। এই নামকরণ ততটাই নির্ভুল, যতটা নির্ভুল মানুষের জ্ঞান।
মানুষের জ্ঞান কতটা নির্ভুল? বিজ্ঞানও তার সিদ্ধান্ত বদল করে। বুদ্ধও অনুতাপ করে। এর অর্থ কি? এর অর্থ- মানুষের জ্ঞান খুব সীমিত। মানুষ এখনো, তার দেহের রহস্যই ভেদ করতে পারে নি। অসীম এই মহাবিশ্বের কতটুকু মানুষ জানে?
এ কথা অরুণ মাজী আজ বলছে কেন? অরুণ মাজী তোমাদেরকে বোঝাতে চায়- মানুষ খামোকা খুব বেশি বিচার করে ফেলে। কাউকে সে চোর নাম দেয়। কাউকে সে সাধু নাম দেয়। কাউকে সে ভদ্র বলে, কাউকে সে অভদ্র বলে গালি করে। এই বিচার কতটা নির্ভুল?
এই বিশ্বে যা কিছু বর্তমান, তাদের সবারই কোন না কোন একটা উদ্দেশ্য আছে। এই বিশ্বে সাধুর যেমন দরকার, পতিতারও তেমন দরকার। আলোর যেমন দরকার, আঁধারেরও তেমন দরকার। সুখের যেমন দরকার, দুঃখেরও তেমন দরকার। কেউই অস্পৃশ্য নয়। কেউই অপাঙতেয় নয়। এই মহাবিশ্বে সব কিছুই, জোড়ায় জোড়ায় বর্তমান। জোয়ার ভাঁটা। রাত দিন। ইত্যাদি। এদের একটার অস্তিত্ব বিনা, অন্যটার অস্তিত্ব সম্ভব নয়।
তোমরা জানো, আমি প্রায় পনেরো বছর ধরে, HUMAN SUFFERING-এর উপর গবেষণা আর পড়াশুনা করছি। মাঝে মাঝে নিজেকে জিজ্ঞেস করি আমি- বুদ্ধ কেন "মধ্যপন্থার" কথা বলে গেছেন? আমার মনে হয়, উনি "মধ্যপন্থা" কথার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন- মানুষ ভালো আর খারাপ বিচার থেকে সমান দূরে থাকবে। মানুষ ভোগও করবে, ত্যাগও করবে। মানুষ সংসার ধর্মও করবে, বৈরাগ্যও দেখাবে। মানুষ সাধুকেও শ্রদ্ধা করবে, পতিতাকেও শ্রদ্ধা করবে। মানুষ শ্লীলতাকেও শ্রদ্ধা করবে, অশ্লীলতাকেও শ্রদ্ধা করবে।
এর কারন কি? কারন- মানুষের বিচার কখনো নির্ভুল বা পূর্ণ নয়। আজকে তুমি যাকে সাধু বা মৌলবী বলে প্রণাম করছো, কালকে তুমি তাকে ধর্ষক বলে গালিও দিতে পারো। "ঈশ্বর বা আল্লাহ" সাধনার আড়ালে তাদের ধর্ষণ মানসিকতা থাকতেই পারে। তা তুমি জানবে কি করে? নির্ভুল জানা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব?
আমি অবাক হই, যখন দেখি- কেউ কোন ছবি আঁকলে, বা লেখা লিখলে- মানুষ সেটাকে অশ্লীল বলে নিন্দা করতে থাকে। এই বিচার কতটা নির্ভুল?
তুমি যখন মাটিতে থাকো, পৃথিবীটাকে তুমি "উঁচু নীচু" "নীল সবুজ ধূসর" দেখো। কিন্তু তুমি যদি অনেক উঁচুতে উঠে যাও, তখন তুমি দেখবে- পৃথিবীটা কেবল এক রঙের। নীলাভ একটা গোলাকার খন্ড। এর অর্থ কি? তোমার জ্ঞান যখন সীমিত, তখন তুমি "উঁচু নীচু" "ভালো খারাপ" বিচার করবে। কিন্তু তোমার জ্ঞানের পরিধি যখন বাড়বে- তখন তুমি দেখবে "ভালো খারাপ", "শ্লীল অশ্লীল" "সুখ দুঃখ" বলে আলাদা কিছু নেই। এরা একই অঙ্গে বহুরূপ।
প্রাচীন ভারতবর্ষ এই দর্শন গভীরভাবে জানতো। তাই তারা একই অঙ্গে "নারী পুরুষ" "সৃষ্টি ধ্বংস" ইত্যাদি এঁকে গেছেন।
আমি কি বলতে চাই জানো? তোমরা ভালো খারাপ, শ্লীল অশ্লীল ইত্যাদির বিচার থেকে শত মাইল দূরে থাকো। পৃথিবীকে পৃথিবীর মতো করে দেখো। দিনকেও ভালোবাসো। রাতকেও ভালোবাসো। সুখকে ভালোবাসো। দুঃখকেও ভালোবাসো। সাধুকেও শ্রদ্ধা করো, পতিতাকেও শ্রদ্ধা করো। তোমরা কেবল পর্যবেক্ষণ করো, আর মুহূর্তটাকে উপভোগ করো। দেখবে তোমাদের জীবন অনেক সুন্দর আর আনন্দময় হবে।
© অরুণ মাজী
Painting: Eugene De Blaas
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem