গোলাপকে যদি ভালো করে শুঁকতে চাও, তো শুধু গোলাপকেই শুঁকতে হবে। গোলাপের সাথে গাঁদা শুঁকলে চলবে না। অর্থাৎ কোন কিছু ভালো করে করতে গেলে, তোমার নিষ্ঠা আর একাগ্রতা দরকার।
আধুনিক সভ্যতায়, "Multi Tasking" বলে একটা কথা অভিধানে যোগ হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- Multi Tasking মানুষ কি করতে পারে? পারে, তবে সে পারা- গোলাপ আর গাঁদা একসাথে শুঁকার মতো। তাতে তুমি না পাবে গোলাপের সুবাস, না পাবে গাঁদার সুবাস। Multi Tasking করলে, তোমার কোন কাজই সুন্দর হবে না।
আশ্চর্য হলো- Multi Tasking আজকাল বড় এক ফ্যাশন হয়ে গেছে! ফাটিয়ে দেওয়ার ভঙ্গীতে, লোকে গর্ব করে বলে- আমি " Multi Tasking" করি।
কিন্তু এর ফল কি? ফল বেশ বিপত্তিকর। তুমি বিরাট কোহলির ছক্কাও দেখছো, আবার সেই সঙ্গে তোমার বৌকে প্রেম মাখানো কথাও বলছো। তোমার বৌ তোমার সম্পর্কে কি ধারণা করবে? যে, তুমি তোমার বৌকে নূন্যতম শ্রদ্ধাটুকুও করো না। এর ফল কি? এই ছোট্ট ভুল তোমাদের দাম্পত্য জীবনে এমন একটা গভীর ফাটল তৈরী করবে, যে তোমাদের সম্পর্ক হয়তো খাতায় কলমে টিকে থাকবে; কিন্তু অন্তরের দিক থেকে তোমরা "ডিভোর্স" হয়ে যাবে। সিডনিতে ডাক্তারি করতে গিয়ে, আমি এমন ঘটনা প্রতিদিন দেখি। ভারতেও দেখি।
আজকাল চারিদিকে এতো ডিভোর্স হচ্ছে কেন? কারন অনেক। কিন্তু অন্যতম একটা কারন- স্বামী স্ত্রী দুই পক্ষেরই "উপর উপর" মিষ্টি কথা (superficial / shallow talk): কিন্তু হৃদয়ে বিশ্বস্ততা বা আন্তরিকতা (sincerity)বলে কিছু নেই। তুমি বিরাট কোহলির ছক্কার দিকে তাকিয়ে। অথচ তুমি তোমার বৌকে, হাসি মুখে বলছো- "O baby, you look so beautiful." তার মুখের দিকে না তাকিয়েই তুমি এ কথা বললে। এ তো তাকে একপ্রকার অপমান। কেমন অপমান? তার সাক্ষাতে, তার সম্পর্কে তুমি, মিথ্যে /আন্দাজে কথা বললে। তাকে তুমি এতো অশ্রদ্ধা করো যে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে তুমি কথাটা বলার প্রয়োজন মনে করো না।
দুর্ভাগ্য এই যে, আমরা সবাই ভাবি- "এগুলো খুব বেশি কিছু নয়"। এই নিয়ে তোমাদের দাম্পত্য সম্পর্কে, চিরদিনের জন্য ফাটল ধরে গেলো, আর তুমি বলছো- এগুলো কিছু নয়? যে সম্পর্ক মানুষকে অপমান করে, সে সম্পর্কে মানুষ থাকবে কেন? সামাজিক /অর্থনৈতিক/আইনী/জৈবিক কারনে হয়তো দৈহিকভাবে তোমরা একসাথে থাকবে। কিন্তু অন্তরের দিক থেকে তোমরা এক লক্ষ মাইল দূরে থাকবে।
মুখোশ পরে সাজতে সাজতে, মানুষ নিজের অজান্তে, নিজেই একটা মুখোশ হয়ে গেছে। অ-বিশ্বস্ততা বা অ-আন্তরিকতা এমন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে অ-বিশ্বস্ততা বা অ-আন্তরিকতা-ও একপ্রকার "Personality Disorder" পর্যায়ে চলে গেছে। আমরা প্রত্যেকেই চরিত্রের মুমূর্ষু রুগী। বেশ লজ্জাজনক।
আমি কবিতা পড়ছি, কিন্তু মন আমার অন্য কিছুতে। আমি মায়ের সাথে কথা বলছি, অথচ মাউস হাতে গেমও খেলে যাচ্ছি। স্বামীর সাথে বেড়াতে বেরিয়েছে, অথচ স্ত্রী সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ফেসবুকে চ্যাট করে যাচ্ছে। এরকম হাজারো উদাহরণ। ছোট্ট ছোট্ট "অ-বিশ্বস্ততা বা অ-আন্তরিকতা" করতে করতে, একদিন আমরা মিথ্যে বলা আর ধাপ্পবাজি শুরু করি। ব্যাস। নরকে পতন। এরূপ নরকে স্খলিত মানুষের সঙ্গে, আমাদের স্বামী বা স্ত্রী-রা ঘর করবে কি করে? আমাদের ছেলে মেয়ে আমাদের সাথে, ভালোবেসে, থাকবে কি করে? সমাজের অন্যান্য মানুষ আমাদের সাথে থাকবে কি করে?
সোস্যাল মিডিয়া আমাদের অনেক কিছু ভালো করছে। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়া কি আমাদের ধৈর্য্য নিষ্ঠা মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে? এতে সোস্যাল মিডিয়ার দোষ নেই। দোষ আমার। কেন? সোস্যাল মিডিয়াতে যতটুকু সময় থাকি, সে সময়ও আমি যদি নিষ্ঠা আর মনযোগ অভ্যাস করি, তাহলে আমার ভয় কি? কিন্তু আমি যদি চরিত্রেই ঠগ আর ধাপ্পাবাজ হই, তো আমি আমার বৌ বা প্রেমিকার সাথেও ধাপ্পাবাজি করবো। তাই না? অরুণ মাজীর প্রণাম তোমাদেরকে। তোমরা ভালো থেকো।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem