রাত প্রায় এগারোটা। অমলের বাবা মা, নীচে ওনাদের ঘরে চলে গেলেন। অমল আমাকে বললো-
"তুমি এখানে অপেক্ষা করো, জিনিসপত্রগুলো এখুনি নীচে রেখে আসছি আমি।"
আমি ওর দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম-
ওনারা নীচে গেলেন, আমরা যাবো না?
অমল হাসলো। বললো-
"এখুনি নীচে যাবে? ছাদে আরও একটু সময় কাটাবে না? "
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই, অমল মাদুর গিটার আর অন্যান্য জিনিসপত্রগুলো নিয়ে, সিঁড়ির দিকে রওনা দিলো। যাওয়ার সময় বললো-
"প্লিজ, একটু অপেক্ষা করো। আমি এগুলো নীচে রেখেই আসছি।"
অমল নীচে নেমে গেলো। ছাদের এক প্রান্তে এসে, পূর্বদিকে মুখ করে, ছাদের পাঁচিলের উপর ঝুঁকে দাঁড়ালাম আমি। মুক্ত আকাশ, ভাবনার আকাশ উন্মুক্ত করে দিলো।
রাত গাঢ় হচ্ছে। মানুষজন এবার ধীরে ধীরে নিদ্রার বুকে ঢলে পড়বে। জেগে থাকবে চাঁদ। জেগে থাকবে রাত্রি। জেগে থাকবে বাতাস। জেগে থাকবে কিছু পশুপাখি। জেগে থাকবে কিছু মানুষও।
কোন এক হাসপাতালে, ভীষণই উৎকণ্ঠা নিয়ে জেগে থাকবে, মরণাপন্ন কোন রোগীর আত্মীয়। জেগে থাকবে ডাক্তার। জেগে থাকবে নার্স। জেগে থাকবে টহলরত পুলিশ পাহারাদার। জেগে থাকবে দুঃখ কাতর কোন পুরুষ। জেগে থাকবে দুঃখ কাতর কোন নারী।
পৃথিবী কি বিচিত্র, তাই না? একই রাত্রি। একই পৃথিবী। তবুও কিন্তু সবার জীবন ধারণ বেশ আলাদা। তাদের পরিস্থিতি আলাদা। স্বপ্ন আলাদা। দুঃখ আলাদা।
চাঁদ ধীরে ধীরে আরও ঊজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বাতাসও আরো শান্ত আর স্নিগ্ধ হয়ে উঠছে। বাতাসের কথা ভাবতেই, চোখ বুজে একটু প্রশ্বাস নিতে ইচ্ছে হলো আমার।
নিলাম। একবার। দুবার তিনবার। আহঃ প্রাণ জুড়িয়ে যায়। হটাৎ যেন মনে হলো, কোথা থেকে এক ফুলের সুগন্ধ আসছে। আরও একবার ভালো করে প্রশ্বাস নিতে যাবো, হটাৎই কারও হাত, আমার পিঠে এসে ঠেকলো। ফিরে দেখি, অমল।
ও জিজ্ঞেস করলো-
"কি ভাবছো? "
এখানে ফুল গাছ কোথায় বলো তো?
"কেন? "
কোথা থেকে যেন ফুলের সুগন্ধ ভেসে এলো।
"আমাদের বাড়ির পিছনে, তিনটে চাঁপা গাছ আছে।"
তাই নাকি? চাঁপা ফুলের গাছ?
"হ্যাঁ। কাল সকালে দেখাবো তোমায়। মায়ের প্রিয় গাছ ওগুলো।"
তাই নাকি? তোমার মায়ের প্রিয়, তোমার প্রিয় নয়?
"আমারও। চাঁপা ফুলের গন্ধ, সবচেয়ে বেশি মিষ্টি লাগে আমার। কিন্তু আমি তো সেই গন্ধ এখন পাচ্ছি না! "
চোখ বুজে, দীর্ঘ প্রশ্বাস নিয়ে দেখো, পাবে।
"তাই? "
অমল চোখে বুজে, ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে শুরু করলো। দুবার শ্বাস নেওয়ার পর ও বললো-
"হুঁ, মৃদু মৃদু গন্ধ আসছে।"
আমি মন্তব্য করলাম-
অনুভব করতে গেলে একাগ্রতা লাগে, তাই না?
ঠিকই বলেছো। কোন কিছু ভালোভাবে অনুভব করতে গেলে, প্রশান্তি আর একাগ্রতা দুটোই লাগে।
অমলের দিকে চেয়ে দেখলাম আমি। তখনও ও, নীল জিন্স আর সাদা পাতলা এক পাঞ্জাবি পরে।
সত্যি কথা বলতে কি, এদের বাড়িতে আসার পর থেকে, অমলকে একটু ভালো করে দেখার সুযোগ পায় নি আমি। বেশ কিছুক্ষণ অমলকে পর্যবেক্ষণ করে, ওর দিকে চেয়ে, মৃদু হাসলাম আমি। ও জিজ্ঞেস করলো-
"হাসলে যে? "
এমনিই। এখানে আসা থেকে, তোমাকে ভালো করে দেখার সুযোগ হয় নি আমার।
"তাই? "
হুঁ, প্রথমে এখানে আসার টেনশান। তারপর, তোমার বাবা মাকে আজই প্রথম দেখলাম, তো ওনাদের সাথে কথাবার্তা ইত্যাদি।
"তোমাকে প্রথমে একটু নার্ভাস লাগছিলো। কিন্তু পরে তুমি বেশ স্বচ্ছন্দ হয়ে গেছিলে।"
হুঁ। ওনারা খুব ভালো মানুষ, তাই। They made feel very comfortable.
"সেটা তোমারও কৃতিত্ব বটে। বাবা মায়ের, তোমাকে খুব ভালো লেগেছে।"
অমলের বেশ কাছে চলে এলাম আমি। ওর প্রায় মুখের কাছে আমার মুখ নিয়ে, ওর চোখে চোখ রেখে, আদুরে গলায় বললাম-
আর তাদের ছেলের?
অমলের চোখ এবার কথা বলতে শুরু করলো। ওর চোখে, ওর সেই সম্মোহিনী দৃষ্টি জেগে উঠলো। সঙ্গে, ঠোঁটের কোণে ওর সেই প্রাণঘাতী হাসি। কিছু বললো না ও। কিন্তু আমার নাকটা ও, আলতো করে ছুঁলো। প্রথমে কেবল তর্জনী দিয়ে স্পর্শ। তারপর- ওর দুটো আঙুল, আমার চোখ কপাল আর গাল স্পর্শ করলো। স্পর্শের আবেশে, ওর বুকে মাথা রেখে, ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম আমি।
নাহঃ ওকে আর ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। অমলও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলো না। আমার চুলে, আঙুল দিয়ে আঁচড় কাটতে কাটতে ও বললো-
"চাঁপার গন্ধ পাচ্ছি প্রীতি।"
ওর বুক থেকে, মাথা না তুলেই জিজ্ঞেস করলাম আমি-
তাই? কোথা থেকে?
"তোমার বুক থেকে বোধহয়।"
কি করে জানলে?
"নাক দিয়ে ভালো করে শুঁকে দেখলেই হয়।"
কিন্তু চাঁদ যে দেখতে পাবে!
"দেখুক। সরাসরি তো ব্যাটা দেখতে পাবে না। লুকিয়ে ওকে দেখতে হবে।"
কিন্তু দেখতে তো পাবে।
পাক গে। একটু........
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem