ততক্ষণে বাড়ির বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছি আমরা। কেমন যেন একটু লজ্জা হলো আমার। কি অদ্ভুত তাই না? নিজের বাড়িতে পৌঁছতে, লজ্জা হচ্ছে আমার। অথচ গতকাল, অমলদের বাড়িতে যেতে লজ্জা হচ্ছিলো আমার।
আর আজ? অমলের বাবা মা আমার সাথে। আর তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে, নিজের বাড়িতে ঢুকতে লজ্জা হচ্ছে আমার।
লজ্জা হবে না কেন? একে অমলের বাবা মায়ের সঙ্গে বাড়ি ঢুকছি আমি। সেই সঙ্গে অমলের মা আমাকে, এক্কেবারে রাজা গজা সাজিয়ে দিলো! নতুন শাড়ি। গলায় নতুন নেকলেস। মুকুটের মতো দেখতে টিয়ারা। সোনার হেয়ার চেন। মনে তো হচ্ছে, টিয়ারাতে হীরে বসানো রয়েছে। জিজ্ঞেস যে করবো, তারও সুযোগ পাই নি আমি?
আমাদের বাড়ির গলিতে ঢুকতেই, ব্যস্ত হয়ে আমি বললাম-
ওই যে বাঁ দিকের তিন নম্বর বাড়িটা, ওটা আমাদের।
বাড়ির দরজায় পৌঁছে, অমলের বাবা গাড়ি থামালেন। গাড়ি থামিয়ে উনি আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। বললেন-
"প্রীতি, পৌঁছে গেলাম তোমাদের বাড়ি।"
আমি ওনার দিকে চেয়ে হাসলাম। ব্যস্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে, কলিং বেল বাজাতে যাবো; তো দেখলাম, গেটের ওপারে বাবা। আমাদেরকে দেখে গেট খুলতে এগিয়ে এসেছে বাবা।
গেট খুললো। দেখলাম, গাড়ির কাছে এগিয়ে এসে, বাবা, অমলের বাবা মাকে নমস্কার জানালো। তারপর অমলের বাবার উদ্দেশ্যে বললো-
"গাড়িটা একটু ড্রাইভওয়েতে ঢুকিয়ে নিন। আপনাদের নামতে সুবিধে হবে।"
ড্রাইভওয়েতে গাড়ি যখন থামলো, দেখলাম, মা-ও একপ্রকার ছুটতে ছুটতে উপস্থিত।
গাড়ি থেকে নামলাম আমরা। মা, অমলের বাবার দিকে চেয়ে, মৃদু হেসে নমস্কার জানালো। তারপর অমলের মাকে নমস্কার জানিয়ে, ওনাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। নজর করলাম, মা ওনাকে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরলো, যেন ওরা অনেক পরিচিত দুই সখী। তা লক্ষ্য করে, অমলের বাবা আমার বাবা- দুজনেই হাসলো।
মা, অমলের মায়ের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আপনাদের সাথে এই মেয়েটি আবার কে? "
অমলের মা হেসে উঠলেন। বললেন-
"ওঃ পরিচয় করানো হয় নি। এ আমার মেয়ে প্রীতি।"
মা আরও দুষ্টুমি করে বললো-
"বাহঃ বেশ সুন্দর দেখতে তো আপনার মেয়ে।"
বাবা আর অমলের বাবা একসঙ্গে হেসে উঠলেন। বাবা, মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
"ওহঃ তুমি আবার প্রীতির পিছনে পড়েছো।"
বাবা, অমলের মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
"জানেন? এরা মা মেয়ে, সদাই লড়তে থাকে।"
অমলের মায়ের হাত ধরে মা বললো-
আসুন, ভেতরে আসুন এবার।
বাড়িতে ঢুকার আগে, অমলের বাবা আমাদের বাড়ির চারপাশটা ভালো করে নজর করে দেখলেন। তারপর আমার দিকে চেয়ে উনি বললেন-
"এসো প্রীতি, ভেতরে যাই।"
ঘরে ঢুকলাম আমরা। অমলের বাবা মাকে সোফাতে বসিয়ে দিয়ে, বাবা তাদের পাশে বসলো। আমি বসলাম- ডাইনিং টেবিল লাগোয়া একটা চেয়ারে। মা আমাদের দিকে চেয়ে বললেন-
"আপনারা একটু বসুন, আমি এখুনি আসছি।"
মা রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো। মাকে সাহায্য করতে, আমিও মায়ের পিছু পিছু রান্না ঘরে এলাম। মা, ট্রেতে চায়ের পাত্র কাপ প্লেট আর জলের গ্লাস নিলো। আমি আরেকটা ট্রেতে নিলাম- পনির বল, চিকেন টিক্কা কাজু বাদাম আর সফ্ট ড্রিঙ্কসের বোতল।
জিনিসপত্রগুলো নিয়ে ড্রয়িং রুমে ফিরে এলাম আমরা। সেগুলো কফি টেবিলের উপর রেখে, মা ওনাদের উদ্দেশ্যে বললো-
আপনারা সফ্ট ড্রিঙ্কস নেবেন? অথবা চা?
ওনারা সবাই চা খেতে চাইলেন। ওনাদের হাতে, প্লেটসহ চা ধরিয়ে দিলো মা। স্ন্যাক্সগুলো টেবিলের উপর ভালো করে সাজিয়ে দিলো। মাকে সাহায্য করলাম আমি। দেওয়া শেষে, মা আর আমি ডাইনিং টেবিল লাগোয়া চেয়ারে বসলাম।
মায়ের পাশে বসতেই, মা আমার দিকে চেয়ে রইলো। বললো-
ঊহঃ কি সুন্দর লাগছে তোকে।
তারপর অমলের মায়ের দিকে চেয়ে মা জিজ্ঞেস করলো-
"এমন সুন্দর করে চুল কি আপনি বেঁধে দিলেন? "
অমলের মা হাসলেন। উনি কিছু বলার আগেই মা বললো-
"ভীষণই সুন্দর।"
মা তারপর আমার নেকলেসটা ছুঁয়ে দেখলো। তারপর টিয়ারা-টা। অমলের মায়ের দিকে চেয়ে মা বললো-
"টিয়ারা-টা তো এখানকার নয়। কলকাতাতে এমন জিনিস কখনো দেখি নি।"
অমলের মা বললেন-
"আমরা যখন প্যারিসে, তখন অমলের বাবা ওটা আমাকে দিয়েছিলো।"
একটু থেমে উনি বললেন-
"আমি তো আর এসব পরি না। তাই প্রীতিকে দিয়ে দিলাম।"
আমি চমকে উঠলাম। ভাবলাম- ওনার হীরে বসানো টিয়ারা, উনি আমাকে দিয়ে দিলেন? ওনার দিকে চেয়ে বললাম-
দিয়ে দিলেন?
অমলের মা-
"হ্যাঁ, তুমি ছাড়া এসব আর পরবে কে? "
সিলিংয়ের দিকে চেয়ে উনি একটু উদাসী হলেন। তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন-
"কোন গহনাই আর পরার সুযোগ হয় না। তাই আমাদের বাড়ির সব গহনাই এখন তোমার।"
মা আমার কাঁধ ছুঁলো। কিছু বললো না। বাবা, অমলের মায়ের দিকে চেয়ে হাসলো। বললো-
"এর অর্থ, আপনারা সব ঠিক করে ফেলেছেন! "
অমলের মা হাসলেন। বললেন-
"ঠিক মানে, আমরা ভেবেছি। এখন পুরো ব্যাপারটা আপনাদের অনুমতি সাপেক্ষ।"
বাবা অমলের মায়ের দিকে চেয়ে আবার হাসলো। অমলের মাও আবার হাসলেন। উনি বাবার উদ্দেশ্যে বললেন-
আপনাদের অনুমতি নিতেই আজ আমাদের আসা। আপনারা অনুমতি দিলে, প্রীতি আমাদেরও মেয়ে হয়ে থাকবে।
মা বাবা কেউই কিছু বললো না। দুজনেই একটু নিঃশব্দ হয়ে গেলো। ঘর জুড়ে কিছুক্ষণের জন্য নিঃস্তব্ধতা। মা আমার কাঁধ ছুঁয়ে ছিলো। সেই স্পর্শ যেন আরও গভীর আর দৃঢ় হলো। অনুভব করলাম, সেই স্পর্শের মধ্যে কেমন যেন এক বেদনা আছে। আসন্ন এক বিয়োগ বেদনা। আমি মায়ের হাতটা চেপে ধরলাম।
নৈঃশব্দ ভঙ্গ করলো বাবা। বললো-
আমাদের সৌভাগ্য, প্রীতিকে আপনারা এতো ভালোবাসেন।
অমলের বাবা বললেন
সৌভাগ্য আমাদেরও। আপনাদের কাছকাছি থাকবো আমরা।
বুঝলাম, অমলের বাবা, আমার বাবা মায়ের কষ্ট সম্পর্কে বেশ অবগত। এবং সেই কষ্ট লাঘবের জন্য, উনি বাবা মাকে পরোক্ষে সাহস দিচ্ছেন।
গভীর অস্বস্তি অনুভব করলাম আমি। বুঝলাম এসব কথবার্তার মধ্যে, বাবা মায়ের স্বপ্নপূরণ হওয়ার আনন্দ আছে। আবার সুগভীর এক বেদনাও আছে। আমার মা বাবা, মাঝে মাঝে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে, কারন তারা সেই আসন্ন বিয়োগ বেদনা অনুভব করছে। বাবা মায়ের কথা ভেবে, বুকের মধ্যে কষ্ট গাঢ় হলো আমার। আমি অমলের মায়ের উদ্দেশ্যে বললাম-
আমি চেঞ্জ করে আসি?
অমলের বাবা আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। বললেন-
প্রীতি লজ্জা পাচ্ছে। কষ্টও পাচ্ছে। ঠিক আছে, এসো তুমি।
ধীর পায়ে সিঁড়ি চড়তে শুরু করলাম আমি। সিঁড়ি চড়তে চড়তে পিছন ফিরে দেখলাম- সকলের নজর আমার প্রস্থানের প্রতি। ওনারা আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। হাসলাম আমিও।
হাসলাম? অথবা হাসি দিয়ে কষ্ট ঢাকলাম? কাপড় চেঞ্জ করতে এলাম আমি? অথবা বাবা মায়ের বেদনা সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে এলাম আমি?
উপরে উঠে, আমার ঘরে ঢুকে সোজা বাথরুমে গেলাম। বাথরুমে চোখ মুখ ধুয়ে, আবার ঘরে ফিরে এলাম। শাড়ি চেঞ্জ করতে করতে ভাবলাম- অমল আর আমার সম্পর্ক কেবল, আমাদের দুজনের সম্পর্ক নয়। সেই সম্পর্ক আমাদের দুজনের বাবা মায়ের সম্পর্কও বটে। সেই সম্পর্কে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের আরও আত্মীয় বন্ধুবান্ধব। জড়িয়ে রয়েছে সৃষ্টি আর তাদের পরিবারও।
এতদিন আমি কেবল, অমল আর আমাকে নিয়ে ভেবেছি। ভাবি নি, বাবা মায়ের বাড়ি ছেড়ে অমলের সাথে থাকলে, কি সাংঘাতিক শূন্যতা তৈরী হবে বাবা মায়ের মনে।
তবুও আমার বাবা মা ভীষণই চায়, আমি বিয়ে করি। বিয়ে করে আমি অমলের সাথে থাকি। কিন্তু সে চাওয়ার মধ্যেও, অদৃশ্য কিন্তু প্রকট এক বেদনা আছে। যে সন্তানকে বুকে করে মানুষ করেছে এতদিন, সেই সন্তান কাছে না থাকলে, মা বাবার বুক শূন্য তো হবেই।
প্রত্যেক আনন্দের সাথে দুঃখ লুকানো থাকে। যোগের সাথে বিয়োগ লুকানো থাকে। জন্মের সাথে মৃত্যু লুকানো থাকে। পাওয়ার সাথে হারানো লুকানো থাকে। প্রত্যেক বাবা মা চায়, তার মেয়ে বিয়ে করে স্বামীর সাথে সুখে ঘর করুক। কিন্তু সেই চাওয়া পাওয়ার মধ্যেও প্রকট এক হারানোর যন্ত্রণা।
বাবা মায়ের যদি এতো কষ্ট হবে, তো কি করি আমি? দায়িত্বহীন প্রেম, কর্তব্যহীন প্রেম, পরিবারের অন্যের প্রতি বিবেচনাহীন প্রেম- ভীষণই নিষ্ঠুর। ভীষণই এক স্বার্থপরতা। কেবল নিজের জীবন নিয়েই ভাববো? আমার বাবা মা, বা অমলের বাবা মায়ের কথা ভাববো না?
নাহঃ তা আমি পারবো না। আমার বাবা মা, এতো কষ্ট করে আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, নিষ্ঠুর অমানবিক হওয়ার জন্য?
কিন্তু উপায় কি? অমলকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় আমার। আর আমাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় অমলের। তো উপায় কি?
দুকূলই যদি হৃদয় মোর
কোন কূলে যাই আমি?
কার বুকে আশ্রয় নিই হে
কার বুক আমি ভাঙি?
এখন বড় হয়েছি আমি। আমার বাবা মা যদি তাদের কষ্টের কথা, তাদের কর্তব্যের খাতিরে না বলতে পারে, তো আমার তা বোঝা উচিৎ। তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য আমার সমস্ত কিছু করা উচিৎ। নতুবা আমার শিক্ষার মূল্য কি? নতুবা আমার বাবা মায়ের ভালোবাসার মূল্য কি? তাদের ত্যাগের মূল্য কি?
শাড়ি চেঞ্জ করে, টিয়ারা আর হেয়ার চেন খুলে, সেগুলো টেবিলে রাখলাম আমি। তারপর ধীর পায়ে নীচে নেমে এলাম আমি। দেখলাম ওরা তখনও বেশ গল্পমগ্ন।
মায়ের পাশে গিয়ে বসলাম আমি। মা আমার দিকে চেয়ে দেখলো। আমি হাসলাম। মা-ও হাসলো।
দেখলাম, অমলের মা সোফা ছেড়ে উঠলেন। তারপর ধীর পায়ে, উনি আমার মায়ের পাশে এসে বসলেন। মায়ের হাতে হাত রেখে উনি বললেন-
"আপনার আমার একই জ্বালা। সন্তান বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে বুক ফাটে আমাদের।"
মা ওনার দিকে চেয়ে হাসলো। কিন্তু চোখ ছল ছল করছে মায়ের। তা দেখে, অমলের মায়েরও চোখ ছল ছল করলো। উনি বললেন-
"চিন্তার কোন কারন নেই আপনার। এর একটা সমাধানসূত্র বের করবো আমরা।"
বাবা সোফাতে বসে জিজ্ঞাসা করলেন-
"কেমন সমাধান সূত্র? "
অমলের মা-
"এমন সমাধান সূত্র, যেন আপনার আমার কারও বুক না খালি লাগে।"
অমলের বাবা লাফিয়ে উঠলেন। বললেন-
"ভেরি গুড আইডিয়া। এমন একটা সমাধান সূত্র বের করতে হবে আমাদেরকে।"
উনি এবার উৎসাহের সাথে আমার দিকে চেয়ে বললেন-
"তুমি কি বলো প্রীতি? "
আমি মৃদুস্বরে বললাম-
হ্যাঁ।
উনি আমার দিকে চেয়ে বললেন-
"এই সমাধানসূত্র তুমি আর অমল ঠিক করবে। পারবে তোমরা? "
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম আমি। তারপর মৃদুস্বরে বললাম-
হ্যাঁ।
উনি বললেন-
"Ah! That's like my girl."
এ কথাটা যেন বেশ শোনা শোনা লাগছে। কে বলে এ কথা?
আমার বাবা। কিন্তু অমলের বাবা তা জানলো কি করে?
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem