মনে হলো, একটু কষ্টের সাথে ফোনটা কাটলো অমল। কাটলো নয়, কাটতে বাধ্য হলো। কারন ও জানে, এখন আমি বাবা মায়ের সাথে, নীচে ড্রয়িং রুমে আছি। বেচারা অমল, হয়তো আরও একটু কথা বলার ইচ্ছে ছিলো ওর!
নাহঃ বেশ হয়েছে। এতো এতো কথা কিসের ওর? কথা একটু কম কম বলতে পারে না ও? জানে না, বেশি বললে কথা ফুরিয়ে যায়? এখুনিই যদি সব কথা ফুরিয়ে যায়, তো পরে কি কথা বলবো? বেশ হয়েছে। হ্যাংলা অমল। পাগল অমল।
ফোনটা কফি টেবিলের উপর রেখে, বাবা মায়ের মাঝেখানে বসলাম আমি। বাবা মা দুজনেই আমার কাঁধে হাত রাখলো। বেশ কয়েকবছর হয়ে গেলো, এমন করে বাবা মা দুজনের মাঝে, মধ্যমণি হয়ে বসি নি আমি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, মানুষ হয়তো পার্থিব সম্পদ বেশি উপভোগ করে। কিন্তু অন্তর সম্পদের উপভোগ তার কমে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হয়তো, তার স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছতে থাকে। কিন্তু বাবা মায়ের বুক থেকে সে বহু দূরে চলে যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে- মানুষ মাটি থেকে দূরে সরে যায়। নদী থেকে দূরে সরে যায়। আকাশ থেকে দূরে সরে যায়। কোথায় যায় মানুষ? কোথায়?
কোথায় যাও হে মানুষ? কোথায় যাও তুমি? জীবিকার কাছে? পার্থিব সম্পদ আর আরামের কাছে? খ্যাতির কাছে? ক্ষমতার কাছে? কোথায়?
কোথায় চলেছো হে মানুষ, কোথায় চলেছো তুমি?
কখনো কি দেখেছো তুমি-
ডিগ্রীর বুকে সুখের দুটি আঁখি?
প্রাসাদের বুকে শান্তির প্ৰতিচ্ছবি?
বিলাসের বুকে নিরাময়ের হামাগুড়ি?
লোভের ভাঁড়ারে পরিতৃপ্তির গুড়মুড়ি?
তিষ্ঠ ক্ষণকাল হে মানুষ, তিষ্ঠ ক্ষণকাল।
দেখো দেখো-
উলঙ্গ চাঁদ আজও কেমন হাসছে!
নিঃস্ব নদী আজও কেমন গাইছে!
বৃদ্ধ পর্বত আজও কেমন
ধীর স্থির অচঞ্চল রয়েছে!
শান্তি বাইরে খুঁজো না হে মানুষ
শান্তি তোমার বাইরে খুঁজো না।
প্রশান্ত সাগরের মতো-
ধীর স্থির অচঞ্চল গভীর না হলে
প্রশান্তির প্রশান্ত সাগর
কিভাবে হবে তুমি?
ত্রিশ বছর বয়স হলো আমার। অথচ এই ভাবনা মাথায় আসে নি আগে। আজ এলো। কেন এলো? কারন, আসন্ন এক বিচ্ছেদ হাতছানি দিচ্ছে আমাদেরকে।
হয়তো এই বিচ্ছেদের ভ্রূকুটি যদি না থাকতো, এই সত্য নিজের জীবনে উদ্ঘাটন করতে পারতাম না আমি। "নিজের জীবনে" কথাটা এ জন্য বলছি, মানুষ যা কিছু নিজের জীবনের অনুভূতি দিয়ে শেখে না, তা সে গভীর ভাবে কখনো শেখে না।
হৃদয়ে আঁচড় না পড়লে, হৃদয় কখনো জাগে না। চেতনায় ঘা না পড়লে, মানুষ কখনো শ্রীচৈতন্য হয় না। বুদ্ধির দ্বারে বজ্রপাত না ঘটলে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি কখনো ঘটে না।
আঁধারের বুকে লুক্কায়িত আলো
মন্দের বুকে ভালো।
মরণের বুকে লুক্কায়িত জনম
পতনের বুকে জাগরণ।
তুমি আমাকে আঁধার দাও, আমি তোমাকে আলো দেখাবো। তুমি আমাকে ঘৃণা দাও, আমি তোমাকে ভালোবাসা দেখাবো। এতো কথা জাগছে কেন বুকে? এতো আত্মবিশ্বাস জাগছে কেন বুকে? আমি কি তবে জাগছি?
কারও হাত, মাথা স্পর্শ করলো আমার। ফিরে দেখি, বাবা। বাবার দিকে তাকালাম আমি। বাবা হাসলো। মা-ও। বাবা আমার দিকে চেয়ে বললো-
কি ভাবছিলি মা?
কিচ্ছু না।
বাবা-
"তুই ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিস দেখে খুব ভালো লাগছে।"
কিছু বললাম না আমি। চুপ করে থাকলাম। বাবা বললো-
"গভীর না হলে প্রশান্ত কেউ হয় না। যারা অগভীর তারাই কেবল চঞ্চল।"
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem