আলো আঁধার ছায়া খন্ড ৩৭ (Preeti) Poem by Arun Maji

আলো আঁধার ছায়া খন্ড ৩৭ (Preeti)

Rating: 5.0

ঘর থেকে বেরিয়ে, ছাদে এলাম আমরা। ছাদের পাঁচিলে ঠেস দিয়ে, পশ্চিম দিগন্তে, অস্তমিত সূর্যের দিকে চেয়ে  রইলাম আমি, চেয়ে রইলো সৃষ্টি।

গোধূলির স্বর্ণচ্ছটা। সোনালী বর্ণ আকাশ। সোনালী বর্ণ সূর্য। প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখে, মানুষের চিন্তা আর কল্পনাও সোনালী সাজে সজ্জিত হয়ে উঠে। অপরূপের ছায়ায় থাকলে; যে অপরূপ নয়, সেও অপরূপ সৌন্দর্য প্রাপ্ত হয়।

উন্মুক্ত আকাশ আর গোধূলির স্বর্ণচ্ছটা দেখে, মন সুন্দর হয়ে উঠে না, এমন কোন মানুষ নেই। চোর ডাকাত, এমনকি খুনীর মনও, অপরূপের স্পর্শে সুন্দর হয়ে উঠে।
এজন্যই পৃথিবীতে সৌন্দর্য থাকতে হবে। মানুষের জীবনে সৌন্দর্য থাকতে হবে। পৃথিবীর সৌন্দর্য, মানুষকেও সুন্দর করে তুলবে। সুন্দরের স্পর্শ বিনা, মানুষ কি কখনো সুন্দর হতে পারে?

প্রকৃতির রূপ ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, মানুষের  কদর্যতা আর নিষ্ঠুরতা। এমন সব ভাবছি, তো হটাৎ সৃষ্টি বলে উঠলো-
"আমরাও একদিন এরকম অস্তমিত হবো, তাই না প্রীতি? "

হুঁ। আমরাও।

"অস্তমিত হওয়ার আগে, আমরাও কি এমন সুন্দর হবো? "

হওয়া তো উচিৎ। কিন্তু কেউ হয়, কেউ হয় না।

"আমরা এখন মধ্যগগনের সূর্য তাই না? "

জোরে হেসে উঠলাম আমি। বললাম-
মানে?

সৃষ্টি আমার দিকে তাকালো না। গোধূলি বর্ণ আকাশের দিকে চেয়েই, বেশ মৃদু স্বরে ও বললো-
জানিস? গতকাল তুই যখন অমুদার বাড়ি গেছিস, তখন নিজেকে খুব শূন্য লাগছিলো। ভাবছিলাম- এতদিন তুই ছিলি কাছে। এবার তোর বিয়ে হবে। তুই ব্যস্ত হয়ে পড়বি নিজের জীবনে। আর আমি বড় একা হয়ে পড়বো।

আর সেজন্যই...

"হ্যাঁ, সেজন্যই বুকের মধ্যে জেগে উঠলো ঋক।"

হুঁ।

"অথচ কি জানিস? ঋককে এক প্রকার ভুলেই গেছিলাম। পাঁচ বছর কোন কথা নেই। কোন সংযোগ নেই। তবুও..."

তবুও...

"হটাৎ ঋকের কথা ভাবতেই, বুকের মধ্যে জেগে উঠলো গাঢ় এক ব্যথা। সেই ব্যথায় এখনও ছটফট করছি আমি।"

সৃষ্টি এবার ঘাড় ঘুড়িয়ে, আমার দিকে চেয়ে দেখলো। ভীষণ একাগ্রতার সাথে ওর কথা শুনছি দেখে, ও আবার বলতে শুরু করলো-
"জানিস? ইচ্ছে হচ্ছে, ঋকের কাছে ফিরে যাই আমি। কিন্তু..."হ্যান্সি

কিন্তু.....

"জানি না, ও এখন বিবাহিত অথবা অবিবাহিত! "

সম্ভাবনা কম। ওর বিয়ে হলে, কোন না কোনভাবে খবরটা পেতাম।

"কে জানে! "

জানিস? তুইই ওর সাথে কথা বলতে পারিস।

"আমি? পাগল হয়েছিস তুই? "

কেন নয়? আমরা এখন বড় হয়েছি। নমনীয় যদি হতে না পারলাম, তো কিসের বড় হওয়া?

"আমার জায়গায় তুই হলে, ওর সাথে তুই কথা বলতে পারতিস? "

"আগে পারতাম না। কিন্তু এখন পারতাম।"

"মানে? "

এখন অনেক কিছু শিখেছি আমি। মনে হয়েছে, আমিও বড় হয়েছি।

"যেমন? "

দম্ভ জেদ অহঙ্কার, মানুষের যন্ত্রণা বাড়ায়। মানুষ হয়ে আমরা জন্মেছি কেন? গর্ব ঔদ্ধত্য বুকে নিয়ে জীবনটাকে নষ্ট করবো বলে? অথবা একটু সুখ আর শান্তি পাবো বলে?

"মানে? "

জীবনে, শান্তি আর সুখই আসল কথা। অহঙ্কার আমাদের সর্ব্বনাশ ডেকে আনে। আমাদেরকে তাই অহঙ্কার আর গর্বকে পরিত্যাগ করতে হবে।

"বলা সহজ। করা কঠিন।"

এখন বড় হয়েছিস তুই। তোকে তা করতে হবে।

"কিন্তু ঋক? "

ঋক তো তোকে, বিয়ে করে কানাডায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। তুই বরং যাস নি।

"বাবা মাকে একলা ছেড়ে যাবো কি করে? "

বাবা মায়ের কথা ভেবেছিস, খুব ভালো কথা। কিন্তু ঋকের কথাও তো ভাবতে হবে।

"ও কানাডা চলে যেতে চাইলো, তো আমি কি করবো? "

কয়েকবছর না হয় ওর সাথে কানাডায় থাকতিস। তারপর দুজনেই আবার ফিরে আসতিস। তাতে, ওরও ইচ্ছে পূর্ণ হতো, তোরও মা বাবাকে দেখাশোনা করা হতো।

"তখন তো তুই এ কথা বলিস নি! "

তখন কি আর এতো বুদ্ধি হয়েছে আমার! এখন তুইও বড় হয়েছিস। আমিও বড় হয়েছি।

এমন সময় হটাৎ, নীচ থেকে মায়ের আওয়াজ ভেসে এলো-
"প্রীতি, অমল এসেছে।"

চমকে উঠলাম আমি। অমল এসেছে? ওর তো এমন সময় আসার কথা নয়। সিঁড়ির কাছে গিয়ে, মায়ের উদ্দেশ্যে চীৎকার করে বললাম-
আমরা এখন ছাদে আছি। ওকে ছাদে পাঠিয়ে দাও।

অমল এসেছে শুনে, সৃষ্টি একটু অস্বস্তিতে পড়লো। ও বললো-
"খবরদার অমুদাকে এসব কথা বলবি না।"

বলবো না কেন? তুই কষ্ট পাবি। আর আমরা তোর জন্য কিছু করবো না?

সৃষ্টি, ছাদের প্রাচীরে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, উপরে উঠতে উঠতে, আমাকে দেখে অমল হাসলো। হাসলাম আমিও। ওর সেই প্রশান্ত প্রাণজুড়ানো হাসি। মনে মনে ভাবলাম, অমল নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক কিছুর গন্ধ পেয়েছে। তাই ও নিজেই চলে এলো। ছাদে ঢুকেই, ও সটান সৃষ্টির দিকে এগিয়ে গেলো। সৃষ্টির দিকে চেয়ে, অমল বললো-
"বাহঃ বেশ ভালো, তুইও এখানে।"

সৃষ্টি অমলের দিকে চেয়ে হাসলো।  দুষ্টুমির সুরে সৃষ্টি বললো-
"আবার তুই, হ্যাংলার মতো আমার বন্ধুর বাড়ি চলে এসেছিস? "

অমল হাসলো। কিছু বললো না। সৃষ্টি বললো-
"প্রীতি বলে তোকে সহ্য করে। আমি হলে, কবে তোকে ভাগিয়ে দিতাম।"

অমল সৃষ্টির দিকে চেয়ে হাসলো। কিন্তু বেশ দৃঢ় স্বরে বললো-
"তোরও এবার একটু সহনশীলতা শেখা দরকার।"

সৃষ্টি-
"মানে? "

অমল-
"মানে আর কিছু নয়। বড় হয়েছি আমরা। আমাদের প্রত্যেকেরই সহনশীলতা শেখা দরকার।"

ভাবলাম, আমার অনুমান সত্যি। অমল নিশ্চয়ই সৃষ্টির পরিস্থিতি অনুভব করতে পেরেছে। আর সেজন্যই হটাৎ ও চলে এলো। অমল সৃষ্টির দিকে চেয়ে বললো-
"তোর জন্য সুখবর আছে।"

সৃষ্টি লাফিয়ে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো-
"কি সুখবর? "

অমল
"তোকে আমরা আজ ফাইভস্টার রেস্টুরেন্টে ডিনার খাওয়াবো।"  

সৃষ্টি
"সত্যি? "

অমল
"অবশ্যই সত্যি। কিন্তু একটা শর্তে।"

সৃষ্টি
"কি শর্ত? "

কোন ভনিতা না করেই অমল বেশ দৃঢ় স্বরে বললো-
"একটা নাম্বার দেবো তোকে। সেই নাম্বারে ফোন করতে হবে তোকে।"

সৃষ্টি এবার চুপসে গেলো। কোন কথা বললো না ও। মুখ নীচু করে আবার ছাদের প্রাচীরের দিকে ফিরে গেলো ও।  তারপর ছাদের প্রাচীরে ঠেস দিয়ে, আকাশের দিকে চেয়ে রইলো ও।

অমল কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর গভীরভাবে কিছু একটা ভেবে, সৃষ্টির দিকে হেঁটে গেলো অমল। আমিও অমলের পিছু পিছু, ছাদের প্রাচীরের দিকে হেঁটে গেলাম। দেখলাম, অমল সৃষ্টির কাঁধে হাত রেখে, আকাশের দিকে চেয়ে রইলো। কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর অমল সৃষ্টিকে বললো-
জানিস? বড় হয়েছি আমরা। ঔদ্ধত্য আমাদের মানায় না। ঔদ্ধত্য ছোটদের আচরণ। বড় হতে হলে, আমাদেরকে আকাশের মতো উন্মুক্ত আর উদার হতে হবে।

সৃষ্টি মাথা তুলে, অমলের দিকে চেয়ে দেখলো। দেখলাম- সৃষ্টির চোখে জল। অমলের চোখেও জল। সৃষ্টি, অমলের বুকে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

© অরুণ মাজী

আলো আঁধার ছায়া খন্ড ৩৭ (Preeti)
Monday, October 26, 2020
Topic(s) of this poem: life,love,romance,romantic
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success