বাসে চেপে বাড়ি ফিরতে ফিরতে, পারো ভাবলো, ছেলেটা বড় একগুঁয়ে। অদ্ভুতও বটে। কোন কথা নেই, পরিচয় নেই; তবুও হটাৎই ও, প্যাকেটটা গুঁজে দিলো আমার হাতে। বড় আশ্চর্য রকমের অদ্ভুত ছেলেটা।
কি আছে প্যাকেটে? একটু খুলি? নাহঃ তার চেয়ে বরং বাড়িতে গিয়ে দেখবো। বাসের মধ্যে, এতো লোকের মাঝে দেখাটা কি ঠিক হবে?
আচ্ছা, ছেলেটা হটাৎ প্যাকেট দিলো কেন আমাকে? আর কেনই বা ও, আমার আসার পথ চেয়ে, স্কুল গেটে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকে? ছেলেটা নিশ্চয়ই খুব দুষ্টু আর অভদ্র হবে।
তা অভদ্র হোক, কিন্তু ছেলেটার চোখ দুটো বেশ সুন্দর। ওই চোখের জন্যই তো, বকতে চাইলেও কখনো বকতে ওকে পারি না। নইলে কবেই স্কুলে নালিশ করে দিতাম আমি!
বাড়ি ফিরেই, পারো ওর মাকে বললো-
মা, আমার ঘরে যাচ্ছি এখন।
ওর মা বললো-
এই তো এলি তুই। মুখ হাত ধুয়ে কিছু খাবি না?
পারো-
নাহঃ এখন খিদে নেই আমার। একটু পরে খাবো আমি।
উপরে, ওর ঘরে উঠে এলো পারো। ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করলো ও। তারপর স্কুল ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে, প্যাকেটটা বের করলো। এরপর বিছানার উপর উঠে, বিছানার ব্যাকরেস্টে ঠেস দিয়ে, প্যাকেটটা খুলতে শুরু করলো পারো।
কাগজে মোড়া বাক্সটা খুলতেই ও দেখলো- প্লাস্টিকের তৈরী খোঁপার একটা ফুল। খুশিতে লাফিয়ে উঠলো পারো। বাহঃ বেশ সুন্দর তো। টকটকে লাল গোলাপ ফুল।
বাক্সটা মধ্যে আরও একবার নজর করলো পারো। নাহঃ আর কিছু নেই। পারো হয়তো ভেবেছিলো, হয়তো কাগজের মধ্যে কোন চিঠি বা চিরকুট জাতীয় কিছু থাকবে। কিন্তু নাহঃ কিছুই নেই আর।
ইশঃ ছেলেটা কি হাঁদা। নিজের নামটুকু পর্যন্ত জানায় নি ও। না জানিয়েছে তো বেশ করেছে। ওকে আমি হাঁদা বলেই ডাকবো। নাহঃ হাঁদা নয়। হাঁদা নামটা একটু রূঢ়। ওকে বরং আগন্তুক বলে ডাকবো আমি।
হাঁদা আর আগন্তুক কথাটা লিখতে গিয়েই, হেসে ফেললাম আমি। সত্যি কথা বলতে কি, আমারও মাঝে মাঝে, অমলকে হাঁদা বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়। আবার কখনো কখনো, অমলকে আগন্তুক বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়।
ধুস! ভালো লাগে না আর! পারোর গল্প লিখতে গেলেই, বারবার অমলের কথা মনে পড়ে আমার। পারোর মধ্যে যেন নিজেকে দেখতে পাই আমি। নাহঃ আজ আর পারোর গল্প লিখবো না আমি। তার চেয়ে বরং অমলকে ভাববো আমি। কেবলই অমলকে। আমার অমলকে।
অমল, তোমাকে আমি চাই নি। নাহঃ চেয়েছি, কিন্তু মুখ ফুটে সে কথা বলতে পারি নি। তুমি যখন কাছে আসতে চেয়েছো আমার, দূরে দূরে সরে গেছি আমি। কেন? কেন সরে গেছি?
তোমাকে ভালো লাগে নি বলে? ভালো যদি লাগে নি, তো তোমাকে চেয়েছি কেন আমি? চেয়েছি যদি, নিজে নিজে ধরা দিই নি কেন? আমি নারী বলে? আমি লজ্জাযুক্ত বলে?
নাহঃ অত বেশি লজ্জাশীল নই আমি। তুমি বরং আমার চেয়ে বেশি লজ্জাশীল। তো তাহলে, সরে গেছি কেন আমি? লুকোচুরি খেলতে? কিন্তু লুকোচুরি তো খেলতে চাই নি আমি। তাহলে এমন লুকোচুরি খেলেছি কেন আমি?
মানুষ যদি তার আবেগকে বুঝতে পারতো, বা তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো; তো মানুষ জাতি বেশ অন্যরকম হতো। এ পৃথিবীও তখন বেশ অন্যরকম হতো। কেমন রকম হতো? ভালো অথবা মন্দ? তা কিন্তু বলা বেশ মুশকিল।
আবেগের বশে, মানুষ যেসব নিষ্ঠুর আর ঘৃণ্য কাজ করে, সেগুলো মানুষ করতো না। কিন্তু আবেগের বশে মানুষ যেসব কবিতা গান লিখে, সেগুলোও মানুষ লিখতো না। আবেগের বশে, একজন মানুষ আর একজন মানুষকে যেভাবে ভালোবাসে, সে রকম ভালোবাসাও সে বাসতো না। কাজেই ভালো মন্দ মিশিয়ে, সেও এক অন্যরকম পৃথিবী হতো।
অমল, তুমি শুনে আশ্চর্য হবে, আবার আমি সেই একই প্রতিপাদ্যে হাজির হচ্ছি। এ পৃথিবীতে শুধু ভালো, বা শুধু খারাপ বলে কিছু হয় না। সব ভালোর মধ্যে, সমান পরিমাণ খারাপ লুকিয়ে থাকে। আবার সব খারাপের মধ্যে, সমান পরিমাণ ভালো লুকিয়ে থাকে।
তুমি বলো তো, তোমার আমার প্রেমের মধ্যে ভালো কোনটা? কোনটা? হয়তো তোমার হাসি। তোমার চওড়া বুক। তোমার ছোঁয়া। তোমার দুষ্টুমি।
আর খারাপ কোনটা? তোমাকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রণা। তোমাকে একটু ছুঁতে চাওয়ার কাতর ইচ্ছে। তোমাকে স্বপ্নে দেখেও, ছুঁতে না পারার বুকভরা শূন্যতা।
আবার তুমি কাছে থাকলে, আমার নিজেকে হারিয়ে ফেলা। কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলা, ভালো অথবা খারাপ? হয়তো খারাপ। নাহঃ খারাপ নয়। নিজেকে হারিয়ে ফেলা বরং বেশ ভালো। নিজের জন্য তখন কোন টেনশান হয় না আর।
"প্রীতি নীচে আয়। খাওয়ার তৈরী।"
নীচ থেকে, মায়ের গলার আওয়াজ ভেসে এলো। গল্প লেখার খাতাটা বন্ধ করে, নীচে নেমে এলাম আমি। দেখলাম- বাবা ডিনার টেবিলে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। মা রান্না ঘর থেকে খাওয়ারগুলো এনে, টেবিলের উপর রাখছে।
সিঙ্কে হাত ধুয়ে, বাবার পাশে বসলাম আমি। বাবা হাসলো। কিন্তু কিছু বললো না। খাওয়ারগুলো সব টেবিলে রাখা হলে, মা আমাদের উল্টোদিকে বসলো। বাবা আর আমার প্লেটে খাওয়ার দেওয়ার পর, মা নিজের প্লেটে খাওয়ার নিতে শুরু করলো। সেই মুহূর্তে মা হটাৎ আমার দিকে চেয়ে বললো-
"জানিস, অমলকে বড় মিস করছি আমি।"
কিছু বললাম না আমি। চুপ করে রইলাম। বাবা পাশ থেকে বললো-
"আমিও মিস করছি অমলকে। কলকাতায় থাকলে ওকে মাঝে মধ্যে তবুও দেখতে পেতাম।"
উত্তর দিতেই হলো আমাকে। বললাম-
সোমবার আসবে ও।
মা আমার দিকে চেয়ে, অনেকটা অধৈর্য্যের সুরে বললো-
"বিয়েটা তোরা তাড়াতাড়ি কর। এমনি করে কি চলে? "
আবার চুপ রইলাম আমি। মা বললো-
"আমাদের কথা ভাবতে হবে না তোকে।"
বাবা হেসে পাশ থেকে বললো-
"ঠিক বলেছে তোর মা। আমরা দিব্যি কাটিয়ে দেবো।"
কিছু না বলে, মায়ের চোখের দিকে তাকালাম আমি। আমাকে তার চোখের দিকে তাকাতে দেখে, কেমন যেন থমকে গেলো মা।
মায়ের ওই চোখের ভাষা আমি জানি। ওই চোখে আঁকা, অনেকদিনের গাঢ় এক ইচ্ছে। আর সেই ইচ্ছের সাথে আঁকা আসন্ন এক বিয়োগ যন্ত্রণা।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem