বাড়ি ফেরার পথে দীঘির কাছে পৌঁছলেই, পারোর মনের মধ্যে, পুরানো সেই সব কাহিনী জেগে উঠে। পারোর মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা, এই দীঘির জল কখনো নীচে নামে না কেন? কেন?
পারো ভাবে, হয়তো এই দীঘির নীচে আছে, লুক্কায়িত এক নদী। সেই নদীই মাটির উপর আত্মপ্রকাশ করেছে এই দীঘি রূপে। এই দীঘি সেই প্রবাহমানা নদীর অংশ বলেই, এর জলস্তর কখনো নীচে নামে না।
পারোর মনে কৌতূহল আরও গাঢ় হয়, সত্যিই কি মাটির নীচে নদী আছে? মাটির নীচে নদী থাকা কি সম্ভব? ইন্টারনেটে অনেক গবেষণা করেছে পারো। পারো জেনেছে, পৃথিবীর অনেক জায়গায় এমন অনেক নদী আছে, যা পাহাড় আর গুহা দিয়ে ঢাকা। এগুলোকে বিজ্ঞানীরা বলেন- subterranean river.
মাটির উপরের অনেক ব্যাপারই, মানুষ এখনো জানে না। তো মাটির নীচের ব্যাপার, মানুষ আর কতটা জানতে পারবে? তাই এই দীঘির নীচেও, এমন এক নদী থাকা অসম্ভব কিছু নয়।
আক্ষরিক অর্থে, কথিত গল্পগুলো প্রায় সবই মিথ্যে। তবুও সেই মিথ্যের জন্ম কিন্তু, কোন এক সত্যকে কেন্দ্র করে। মানুষ পুরানো দিনের সেই সত্যকে, তার বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে নি। তাই সে কল্পিত গল্প ফেঁদে, তার দুর্বলতা ঢেকেছে।
সব মিথ্যের মাঝে একটা করে সত্য লুকিয়ে আছে। সব কথিত গল্পের মধ্যে, একটা করে সত্য গল্প লুকিয়ে আছে। সব কুসংস্কারের মধ্যে, একটা সুসংস্কার লুকিয়ে আছে। কিন্তু মানুষ তার বুদ্ধি প্রয়োগ করে, সেই সত্য বা শুভ অংশকে খুঁজে বের করতে তত বেশি আগ্রহী নয়।
মানুষ জন্মগত ভাবে অলস। গোঁয়ার। দাম্ভিক। কুসংস্কারের জালে ফেঁসে, যুগযুগ ধরে মানুষ যন্ত্রণা পাবে, তবুও সে কুসংস্কারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা, সত্যকে আবিষ্কার করবে না। কেউ কেউ আবার সেই কুসংকারের সুযোগ নিয়ে, নিজের ধন সম্পদ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফল? কুসংস্কার যুগযুগ ধরে বেঁচে থাকে। কখনো কখনো তা বাড়তেও থাকে।
মানুষের উচিৎ বিজ্ঞানের পদ্ধতি অনুসরণ করে, সেই সত্যকে খুঁজে বের করা। সেই শুভ অংশকে খুঁজে বের করা।
পারোর মনে হলো, দীঘির ধারে আজ একটু বসা যাক। সত্যি কথা বলতে কি, পারোর মনটা আজ ভালো নেই। ছেলেটাকে আজ সে দেখে নি। কেন দেখেনি? ছেলেটা কি আজ স্কুলে আসে নি আজ? ছেলেটার জন্যই তো, পারো আজ লাল ফুল খোঁপায় গেঁথে স্কুলে গেছিলো!
ব্যাগটা পিঠ থেকে নামিয়ে, পাশে রাখলো পারো। তারপর ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসলো। ছেলেটা বড় অদ্ভুত! তাই না? গতকাল, সে নিজেই আমাকে খোঁপার ফুল দিলো। আর আজ সে বেপাত্তা। ছেলেটা পাক্কা একটা পাগল হবে।
পাগল হোক আর যাই হোক। ছেলেটার চোখ দুটো কিন্তু খুব সুন্দর। কেমন যেন মায়াবী আর আকর্ষক। ছেলেটাকে আজ সে দেখেনি বলেই, ক্লাসে মন বসে নি তার।
পারো ভাবলো, ধুস, ছেলেটার কথা এতো ভেবে কি হবে? ছেলেটা কে? ছেলেটাকে সে ভালো করে এখনো চেনে না। তার নাম পর্যন্ত জানে না। তো? নাহঃ ছেলেটার কথা আর ভাববে না পারো।
ভাবতে পারো চায় না, ভাবনাটা তবুও বারবার মাথায় আসছে পারোর। পারো দেখলো, দীঘির জলটা হটাৎ একটু নড়ে উঠলো। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে ও দেখলো, শালুকের পাতার উপর ছোট্ট একটা পাখি। মাঝে মাঝে জলের মধ্যে, ঠোঁট আর মাথা ডুবিয়ে কি যেন কি খুঁজছে।
হটাৎ সেই শালুক পাতার কাছে, প্রকান্ড এক ঢেউ। সাংঘাতিক বড় কোন মাছ হবে। পারো জানে, কোন অজানা কারনে, লোকে এই দীঘিতে মাছ ধরতে ভয় পায়। তাই এই পুকুরে, দানব আকৃতির মাছ বা অন্য কোন জলজ প্রাণী থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
পাখিটা বোধহয় বিপদের গন্ধ পেলো। ফুড়ুৎ করে উড়ে গেলো সে। ক্ষুদ্র প্রাণীও তাদের বিপদ বুঝতে পারে। তাই না? এই মহাবিশ্বের প্রত্যেক জীবের মধ্যে এক সহজাত ক্ষমতা আছে, যা তাদের আত্মরক্ষায় সাহায্য করে। তাই না? কেউ গন্ধ শুঁকে তাদের বিপদ বুঝে। কেউ চোখে দেখে। কেউ শব্দ শুনে। কেউ মাটির কম্পন অনুভব করে।
দীঘির জলের উপর এখন ডুবন্ত সূর্যের প্রতিবিম্ব। দীঘির জলের রঙও, কেমন যেন গাঢ় সোনালী হয়ে উঠলো। নাহঃ আর বসে থাকা যায় না। বাড়ি ফিরতে হবে। মা নিশ্চয় ভাবনা করতে শুরু করে দিয়েছে।
সব ওই ছেলেটার দোষ। সব। কেনই বা ও, স্কুল গেটে অমন করে দাঁড়িয়ে থাকে? কেনই বা, আমাকে খোঁপার ফুল দিলো ও? নাহঃ অনেক হয়েছে। এবার বেশ কড়া করে ছেলেটাকে বকে দেবে পারো।
মনে মনে হাসলাম আমি। আবার। কেন জানি, পারোর ছবি আঁকতে গিয়ে, নিজেকে এঁকে ফেলি আমি। পারোর ভাবনা, কি আমার ভাবনা নয়? নিশ্চয়ই আমার। হয়তো এর মধ্যে অনেক কল্পনা আছে। কিন্তু সে কল্পনা কি আমার অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি থেকে তৈরী নয়?
কটা বাজে এখন? ব্যস্ত হয়ে ল্যাপটপের ঘড়িতে চোখ রাখলাম আমি। দেখলাম সকাল প্রায় দশটা। আর একটু পরেই অমল কলকাতায় পৌঁছবে। হ্যাঁ অমল। আমার অমল।
আমি কি এয়ারপোর্টে যাবো? যেতে তো চাই। কিন্তু অমল যে মানা করেছে আমায়। মানা করলেই হলো? ওর মানা আমি শুনবো কেন? অমল আমার কে, যে ওর মানা আমি শুনতে যাবো? নাহঃ কারও মানা আমি শুনবো না। অমল কলকাতায় ফিরছে। আমি ওকে নিতে যাবো। ব্যাস।
কথাটা মনে জাগতেই, নীচে, রান্নাঘরে ছুটে গেলাম আমি। মাকে গিয়ে বললাম-
মা, আমি একটু বেরুবো এখন।
মা তখন খাওয়ারগুলো ডাইনিং টেবিলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছিলো। আমার হাতে ডালের পাত্রটা ধরিয়ে দিয়ে মা বললো-
"বেরোবি! কোথায়? "
একটু বিরক্তির সুরে আমি বললাম
ঊহঃ সব কিছুতে তোমার গোয়েন্দাগিরি।
আমার দিকে চেয়ে, এবার একটু গম্ভীর হয়ে মা বললো-
"হুঁ, বুঝেছি।"
আমি
কি বুঝেছো তুমি?
মা
"এয়ারপোর্ট যাবি তুই।"
আমি
না যাওয়ার কি আছে?
মা
"সেটাই তো কথা আমার। অমল আসছে, তুই ওকে নিতে যাবি না? "
আমি
মানে?
মা
"তুই গেলে অমল খুব খুশি হবে।"
মা হাসলো। মায়ের সেই দুষ্টুমি হাসি। আমি কিছু বললাম না। খাবারগুলো টেবিলে রেখে মা বললো-
"আয়, আমার সাথে খেয়ে নে। আমিও এখন স্কুলে যাচ্ছি।"
সিঙ্কে হাত ধুয়ে, মায়ের পাশে, চেয়ারে বসলাম আমি। আমার প্লেটে ভাত দিতে দিতে মা বললো-
"তোর জন্য কি গাড়ি রেখে যাবো? "
আমি
নাহঃ আমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে নেবো।
মা
"ট্যাক্সি নিতে হবে না। তুই তৈরী হয়ে নে। তোর বাবাকে বলছি, তোর জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেবে এখুনি।"
আমি
আর বাবা?
মা
"সে ট্যাক্সি নিয়ে ফিরতে পারবে আজ।"
দ্রুত খাওয়া শেষ করে মা উঠে পড়লো। বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, জুতো পরতে পরতে মা বললো-
"অমলকে আসতে বলিস এখানে। বলিস, আমি ডেকেছি।"
মা বাইরে বেরিয়ে গেলো। আমারও খাওয়া প্রায় শেষ। তর্জনীর ডগায় চাটনি নিয়ে, সেটা ঠোঁট দিয়ে চাটতে চাটতে ভাবলাম- ধুস! অমল আসবে তো আমার কি? অমল আসবে, ওকে এয়ারপোর্টে একটু নিতে যাবো। ব্যাস। ওইটুকুই। এতে এতো তাড়াহুড়ো কিসের? তার চেয়ে আমি বরং, চাটনিটা একটু রসিয়ে রসিয়ে খাই।
হটাৎ ভাবলাম আবার- কটা বাজে এখন? সাড়ে দশটা? যাহঃ দেরী হয়ে যাচ্ছে। অমলটা না একটা যা তা। ওর কথা ভাবলেই, মাথার ঠিক থাকে না আমার। ওকে বেশ কড়া করে বকে দেওয়া দরকার। হ্যাঁ। বেশ কড়া করে। ওরই তো সব দোষ।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem