কোন উপায় না দেখে, সোফা ছেড়ে উপরে উঠে এলাম আমি। দেখলাম অমলের ঘরের দরজা খোলা। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অমলের উদ্দেশ্যে বললাম-
আসবো আমি?
মনে হলো, অমল যেন বাথরুম থেকে উত্তর দিলো-
"এসো।"
ঘরে ঢুকে বুঝলাম, অমল তখনও বাথরুমের মধ্যে। ওর বিছানার উপর উঠে, ব্যাক রেস্টে হেলান দিয়ে বসলাম আমি। স্নান করে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছি আমি। এখন আর স্নান করতে ইচ্ছে হচ্ছে নাআমার । ভাবছি, অমল বেরোলে, মুখ হাত কেবল ধুয়ে নেবো আমি।
হটাৎ শুনলাম, অমলের মায়ের গলার আওয়াজ। উনি জিজ্ঞেস করলেন-
"আসবো আমি? "
আমি ব্যস্ত হয়ে খাট থেকে নেমে বললাম-
আসুন।
দেখলাম, ওনার হাতে, আমার জন্য জামা কাপড়। সেগুলো ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে উনি বললেন-
এগুলো পরে নাও। অনেক বেশি আরাম বোধ করবে তুমি।
ওনার দিকে চেয়ে হাসলাম আমি। উনিও হাসলেন। তারপর উনি নীচে নেমে গেলেন।
আবার খাটের উপর চড়ে বসলাম আমি। ভাবলাম, আমাকে সহজ অনুভব করানোর জন্য অমলের মা অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবুও কিন্তু, আমার মধ্যে লজ্জা একটু থেকেই যাচ্ছে।
মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগলো, এই লজ্জাবোধ, ভালো অথবা খারাপ? কথিত এই যে, লজ্জা নারীর ভূষণ। লজ্জাবোধ ব্যাপারটা হয়তো পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে মানায় না। কিন্তু আমাদের বাঙালী সংস্কৃতির সাথে বেশ মানায়। আমি যেহেতু বাঙালী বাড়ির বৌ হতে চলেছি, তাই আমার এই লজ্জাবোধ ধরে থাকাই ভালো।
বৌ কথাটা মনে হতেই নিজের মনে হাসলাম আমি। মনে হলো, ইশঃ প্রীতি আচার্য এখন কত বড় হয়ে গেছে। এখন সে, মুখার্জী বাড়ির বৌ হতে চলেছে। দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় এলো। মনে হলো, অমলকে জিজ্ঞেস করি, আমাকে সত্যিই বৌ বৌ লাগে কিনা। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, নাহঃ আজ বরং থাক। বেচারা বিদেশ থেকে ফিরেছে এখন। ওর পিছু না লাগাই ভালো।
বাথরুম থেকে অমল জিজ্ঞেস করলো-
"তুমি কি স্নান করবে? "
না। স্নান করে বেড়িয়েছি আমি। মুখ হাত ধুয়ে নেবো শুধু।
"আর এক মিনিট। আমি প্রায় রেডি।"
মুহূর্তেই অমল বেরিয়ে এলো। পরণে ওর, জিন্স আর সাদা পাঞ্জাবি। ওর ফেবারিট ড্রেস। আমাকে বিছানায় ঠেস দিয়ে বসে থাকতে দেখে, অমল হাসলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ও বললো-
"যাও, তুমিও বরং তৈরী হয়ে নাও। মা বাবা অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।"
জামাকাপড় গুলো নিয়ে বাথরুমে ঢুকালাম আমি। সিঙ্কে গিয়ে আগে মুখ হাত ধুলাম। তারপর, অমলের মায়ের দেওয়া শাড়িটা ঘরোয়াভাবে পরে নিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, সুঁতির এই শাড়ি পরে, নিজেকে বেশ হাল্কা মনে হচ্ছে আমার।
কি জানি কেন, ঘরোয়া শাড়িটা পরতেই, অন্যরকম অনুভূতি হলো আমার। মনে হলো, আমি যেন এ বাড়ির কেউ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলাম আমি। নিজের মুখের দিকে চেয়ে হাসলাম। নিজেকে বললাম-
তুমি কত বড় হয়ে গেছো প্রীতি। তুমি এখন এ বাড়ির বৌ।
কিছু একটা ভেবেই, দ্রুত বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। দেখলাম, ওর আলমারি থেকে কি যেন বের করছে অমল। ওর পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম ওকে-
আচ্ছা, আমাকে কি এ বাড়ির বৌ বৌ লাগছে?
অমল ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে আমাকে পর্যবেক্ষণ করলো। দেখলাম, ওর চোখ আর ঠোঁটের কোণে, খুশির হাসি। ও বললো-
হুম। তোমাকে ভীষণই, এ বাড়ির বৌ বৌ লাগছে।
হটাৎ দেখলাম, অমল ওর সুটকেস খুলতে শুরু করলো। সুটকেস খুলে, প্লাস্টিকের একটা বাক্স বের করলো। বাক্সের ঢাকনা খুলতেই দেখলাম- হাল্কা নীল রঙের সুন্দর একটা নেকলেস। নেকলেসটার দিকে চেয়ে হাসলাম আমি। অমলও হাসলো। ও এবার আমার পিছনে দাঁড়ালো। তারপর কোন কথা না বলে, নেকলেসটাকে ও আমার গলায় পরিয়ে দিলো।
নেকলেসটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে, অমলকে জিজ্ঞেস করলাম-
এটা কি দিয়ে তৈরী গো? বেশ সুন্দর তো!
"জেমস্টোন।"
আর পেনডেন্ট-টা?
"ক্রিস্টাল।"
এ রকম জিনিস কলকাতায় দেখি, কিন্তু সেগুলো এতো সুন্দর হয় না।
হুঁ। নিউইয়র্ক থেকে নিলাম এটা।
নেকলেসটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম আমি। ঘটনাচক্রে, আমার শাড়ির রঙও আজ হাল্কা নীল। বেশ সুন্দর মানিয়েছে শাড়ির সাথে। অমলের দিকে চেয়ে দুষ্টু হাসি হাসলাম। বললাম-
থ্যাঙ্ক ইউ।
অমল হাসলো। ও বললো-
থ্যাঙ্ক ইউ বরং তোমাকে। তুমি পরেছো ওটা।
অমলের কাছে এসে, ওর বুকে মাথা রেখে, আলতো করে জড়িয়ে ধরলাম ওকে। অমল আমাকে ওর বুকে চেপে ধরলো। কিছুক্ষণ এভাবে চুপ থাকার পর, আমার পিঠে হাত বুলিয়ে ও বললো-
তোমাকে ছেড়ে থাকতে, বড্ড কষ্ট হচ্ছিলো প্রীতি।
কিছু বললাম না আমি। আরও জোরে ওকে চেপে ধরলাম আমি।
স্পর্শ যে গল্প বলতে পারে, শব্দ তা পারে না। স্পর্শ যে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, শব্দ তা পারে না। স্পর্শ যে প্রকার নিরাময় আনতে পারে, এক পৃথিবী ঔষধ তা পারে না। স্পর্শ যে প্রকার বন্ধুত্ব গড়তে পারে, এক আকাশ প্রতিশ্রুতি তা পারে না।
কেন যেন মনে হলো, অমলকে ছুঁয়েই যেন, আমার মধ্যে জমে থাকা সব কথা বলে দিলাম আমি। নিজেকে আমার, কেমন যেন হাল্কা মনে হলো। তৃপ্ত মনে হলো। দশদিন অমলকে না দেখে, যে যন্ত্রণা জমে ছিলো বুকে; অমলকে ছুঁয়ে দিতেই, সেই যন্ত্রণা মুছে গেলো মুহূর্তে। এক মুহূর্তে।
কিছুক্ষণ পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকার পর, আমি বললাম-
চলো, নীচে যাই আমরা।
অমল হাতটা বাড়িয়ে দিলো। ওর হাত ধরলাম আমি।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem