কয়েকদিন আগে, মায়ের সাথে গড়িয়াহাট বাজারে গেছিলাম। হটাৎ দেখলাম, মা একটা পাঞ্জাবির দোকানে ঢুকলো। বেশ হলাম আমি। আমি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই, মা আমার দিকে চেয়ে বললো-
"অমলের জন্য দু জোড়া পাজামা পাঞ্জাবি পছন্দ কর তো।"
আমি বললাম-
অমলের জন্য! কেন?
"ও আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে আসে। ওর জন্য বাড়িতে নতুন কিছু পোশাক রাখা দরকার।"
মনে মনে ভাবলাম, প্রেম করি আমি। কিন্তু মাথা ব্যথা মায়ের। যেসব ছোট্ট ছোট্ট কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় জিনিস, আমার মাথায় আসে না; মা সেগুলো মনে করিয়ে দেয়।
এমন না হবেই বা কেন? মা-ও তো এক কালে বাবার প্রেমিকা ছিলো। মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা মানুষকে যেমন সুন্দর করে শেখায়, তা কি আর বই পড়ে কখনো শেখা যায়।
আজকের কথাটাই ধরা যাক। দীর্ঘদিন পর অমল, আমেরিকা থেকে ফিরে আমাদের বাড়ি এসেছে। তাই অমলের মা-ই আমাকে ফোন করে বললো, এতো রাতে অমলের বাড়ি ফেরার কোন দরকার নেই।
অমলের মা বোঝেন, দীর্ঘ ব্যবধানের পর, প্রেমিক প্রেমিকার হৃদয়ের আকুতি কতটা। দীর্ঘ ব্যবধান প্রেমিক প্রেমিকার হৃদয়ের মধ্যে কতটা শূন্যতা তৈরী করে। অমলের মা-ও, এক কালে অমলের বাবার প্রেমিকা ছিলেন। তারও অভিজ্ঞতা, জীবন থেকে পাওয়া।
আমার মা বা অমলের মায়ের এই সাহায্য কি শুধু, তাদের অভিজ্ঞতার জন্য? নাহঃ। এর মধ্যে নিগূঢ় এক ভালোবাসাও আছে। আমার মা, অমলকে ভীষণ ভালোবাসে। আর অমলের মা, আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আজ তাই অমলকে ফোন না করে, অমলের মা আমাকে ফোন করলো।
ধন্য আমি। ঈশ্বরের আশীর্বাদ পুষ্ট আমি। যা মুখ ফুটে চাই নি, জীবনের সেই মহার্ঘ্য ধনগুলোও বারবার পাচ্ছি আমি। কে বলে, জীবনে শুধু অবিশ্বাস আর প্রতারণা? জীবনে শুধু দুঃখ আর যন্ত্রণা?
জীবনে ভালোবাসা নেই? ত্যাগ নেই? সহমর্মিতা নেই? অবশ্যই আছে। না থাকলে আমার জীবনে এতো সুখ কেন? হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যাচ্ছে আমার। হৃদয়ের জানলা খুললেই, হৃদয় ভরে যাচ্ছে আমার।
আসলে, মানুষ তার হৃদয়ের দ্বার বন্ধ করে নালিশ করে, তার হৃদয়ে আলো ঢুকছে না কেন? কিন্তু হৃদয়ের দ্বার খোলা না রাখলে, আলো ঢুকবে কি করে? মনের জানালা খোলা না রাখলে, নতুন হিমেল হাওয়া ঢুকবে কি করে?
আমাকে তন্ময় হয়ে ভাবতে দেখে মা বললো-
"অমল সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরে, তাই না? "
হ্যাঁ।
"তাহলে একটা সাদা পাঞ্জাবি নে। আরেকটা রঙিন।"
কথাগুলো বলে, সেলসম্যানের উদ্দেশ্যে মা বললো-
"ভাই, আমাদেরকে কতকগুলো সাদা আর রঙিন পাঞ্জাবি দেখান তো।"
সেলসম্যান আমাদের সামনে কয়েকডজন পাঞ্জাবি ঢেলে দিলো। পাঞ্জাবিগুলো দেখতে দেখতে, একটা মেরুন রঙের পাঞ্জাবির উপর চোখ আটকে গেলো আমার। মাকে বললাম-
ঐ মেরুন রঙের পাঞ্জাবিটা নেবো?
মা খুশির হাসি হাসলো। বললো-
ঠিক বলেছিস, আমারও ওটা পছন্দ।
সাদা আর মেরুন রঙের দুটো পাঞ্জাবি কিনেছিলাম সেদিন।
রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে, উপরে আমার ঘরে এলাম। ঘরে ঢুকেই, আলমারি খুলে সেই মেরুন রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা বের করলাম। সেগুলো অমলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম-
যাও ফ্রেশ হয়ে নাও তুমি।
পাঞ্জাবিটা দেখে অমল বেশ অবাক হলো। আমার দিকে চেয়ে মিষ্টি হাসি হাসলো ও। জিজ্ঞেস করলো-
নতুন কিনলে নাকি? বেশ সুন্দর রঙ তো।
হুঁ। মা কিনেছে তোমার জন্য।
"বাহঃ দারুন সুন্দর। রঙটা কে পছন্দ করলো? "
মা আর আমি দুজনেই।
"তাই? "
অমলের চোখে, খুশির হাসি। পাঞ্জাবি আর পাজামা নিয়ে বাথরুমে ঢুকলো অমল। ও বাথরুমে ঢুকতেই, ভাবলাম- আজ রাতে কি পরবো আমি? প্রথমে ভাবলাম নাইট গাউন। তারপর ভাবলাম, নাহঃ অমলের মায়ের দেওয়া, ঘরোয়া শাড়িটাই বরং পরবো আজ।
সত্যি কথা বলতে কি, আগে আমি শাড়ি খুব বেশি পরি নি। চুড়িদার প্যান্ট শার্ট- এসবই পরেছি বেশি। কিন্তু আজকাল মনে হয়, শাড়িতেই আমাকে বেশি সুন্দর লাগে। শাড়িতেই আমার ব্যক্তিত্ব আর চরিত্র ভালো প্রকাশ পায়।
শুধু আমাকে কেন? সব বাঙালী মেয়েকেই, শাড়িতেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে। শাড়িতেই মেয়েদের ব্যক্তিত্ব আর চরিত্র ভালো করে ফুটে উঠে।
শাড়ি এমন একটা All in One পোশাক, যা সমস্ত রকম অবস্থায় গর্বের সাথে পরা যায়। এমনকি বিভিন্ন প্রকার নাচের ড্রেস হিসেবেও শাড়ির তুলনা নেই। ভারত নাট্যম ইত্যাদি অনেক নাচ, আমি প্রথাগত ড্রেসে দেখেছি। কিন্তু শাড়িতেই ভরতনাট্যম নাচ, বেশি ভালো লেগেছে আমার।
শায়া ব্লাউজ আর শাড়িটা আলমারি থেকে বের করে, বিছানার উপর রাখলাম আমি। তারপর গলার নেকলেসটা খুলে টেবিলের উপর রাখলাম আমি।
অমল বাথরুমের দরজা খুললো। বাথরুম থেকে ও বেরিয়ে আসার আগেই, ওর দিকে চেয়ে রইলাম আমি। ওকে বললাম-
ইশঃ কি সুন্দর লাগছে তোমাকে।
অমল হেসে বললো-
"তাই? কেন যে আমি সারা জীবন শুধু সাদা পাঞ্জাবি পরেছি! "
অমলের কাছে গিয়ে, ওর বুকে চিমটি কেটে, হেসে আমি বললাম-
this is why every man must have a woman.
"মানে? "
নারীর ছোঁয়া ছাড়া পুরুষ কখনো সুন্দর হয় না।
"now I know that well."
অমলের বুকে আরও একবার চিমটি কেটে বললাম-
অবশ্য এর উল্টোটাও সুন্দর।
"মানে? "
every woman must have a man.
"কেন? "
পুরুষের স্পর্শ ছাড়া নারী সুন্দর হয় না।
"তাই? "
হুঁ। আমার বুকের দিকে তাকালে বুঝতে পারো না?
"মানে? "
তুমি ছুঁয়ে দিতে, আমার বুকটা এখন আকাশের মতো উঁচু হয়ে উঠেছে।
অমল হাসলো। ও আমার বুক ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করতেই, অনেকটা দূরে সরে গেলাম আমি। বললাম-
ঊহঃ তোমার সবকিছুতে তাড়াহুড়ো। এখন আমি স্নান করবো। তারপর।
"তারপর কি? "
যাও। তুমি বড় অসভ্য।
কপট রাগের সুরে কথাগুলো বলেই, বাথরুমের দরজার প্রান্ত থেকে অমলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে, বাথরুমে ঢুকে গেলাম আমি। বাথরুমের দরজা বন্ধ করতেই অমল বললো-
আকাশের রামধনুর কথা মনে করিয়ে দিলে, অথচ ভালো করে দেখতে দিলে না। This is kind of a torture.
বাথরুম থেকে, মৃদু চিৎকার করে আমি বললাম-
he who has patience deserves heaven.
অমল বললো
ঠিক আছে, তাহলে heaven-এর অপেক্ষায় রইলাম আমি।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem