বাথরুমে ঢুকে, শাওয়ারের ট্যাপ খুলে, সোজা শাওয়ারের নীচে দাঁড়ালাম আমি। মাথায় ঠান্ডা জল পড়তেই মনে হলো, আচ্ছা, একটু কি বেশি সাহসী হয়ে উঠলাম আমি? পরক্ষণেই মনে হলো, ধুস, সাহসী না হওয়ার কি আছে? অমল আমার। তো অমলকে যা খুশি বলতে পারবো না আমি?
ভালোবাসার মধ্যে কোন ভয় নেই। কোন পিছুটান নেই। কোন কিন্তু নেই। কোন দ্বিধা নেই। অমলকে যদি হৃদয়েই গ্রহণ করেছি আমি, তো ভয় কিসের? দ্বিধা কিসের? কিন্তু কিসের?
"তোমাকে সব কথাই বলতে পারি, কিন্তু...." প্রেমে এই কিন্তু থাকবে কেন? যা মনের মধ্যে আছে, তাই বলে দেবো। যা ইচ্ছে হচ্ছে, তাই বলবো। দ্বিধা থাকবে কেন? অবিশ্বাস থাকবে কেন? শর্ত থাকবে কেন?
ভালোবাসা নিঃশর্ত। শর্তযুক্ত ভালোবাসা, ভালোবাসা নয়। শর্ত যুক্ত ভালোবাসা, পারস্পরিক সুবিধাভোগের চুক্তি।
ভালোবাসা সদা বিরাজমান। সর্বত্র বিরাজমান। পরিস্থিতি ভেদে বদলায় না। স্থান ভেদে বদলায় না। কাল ভেদে বদলায় না।
ভালোবাসা মস্তিষ্কের ব্যাপার নয়, হৃদয়ের ব্যাপার। ভালোবাসা অঙ্কের ব্যাপার নয়, আবেগের ব্যাপার। ভালোবাসা পার্থিব ব্যাপার নয়, স্বর্গীয় ব্যাপার। ভালোবাসা ধন সম্পদ খ্যাতির ব্যাপার নয়, হৃদয়ের স্পন্দনের ব্যাপার।
ভালোবাসা এক মহাসাগর। যা অতল। অনন্ত। কূলহীন। প্রান্তহীন। সংজ্ঞাহীন। আকারহীন। বর্ণহীন। ভালোবাসা ঈশ্বরের অন্য রূপ। ঈশ্বরই ভালোবাসা। ভালোবাসাই ঈশ্বর।
ভালোবাসা হৃদয়ের অংশ। দেহের অংশ। মনের অংশ। কল্পনার অংশ। স্বপ্নের অংশ। জন্মের অংশ। মৃত্যুর অংশ। জীবনের অংশ। ভালোবাসা সর্বশক্তিমান।
ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়। তার দেহ বদলে দেয়। মন বদলে দেয়। মস্তিস্ক বদলে দেয়। কল্পনা বদলে দেয়। স্বপ্ন বদলে দেয়। জীবন বদলে দেয়।
হে অমল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কোন দ্বিধা ছাড়াই ভালোবাসি। কোন ভয় ছাড়াই ভালোবাসি। কোন শর্ত ছাড়াই ভালোবাসি। একজন শিশু যেমন তার মাকে ভালোবাসে, আমি তোমাকে তেমন করে ভালোবাসি। শিশির বিন্দু যেভাবে দূর্বাকে ভালোবাসে, আমি তোমাকে তেমন করে ভালোবাসি। রাতের নদী যেমন চাঁদকে ভালোবাসে, আমি তোমাকে তেমন করে ভালোবাসি। চাঁপার সুবাস যেমন সমীরণকে ভালোবাসে, আমি তোমাকে তেমন করে ভালোবাসি।
দূর্বার আগায় শিশির বিন্দুর মতোই, আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরতে চাই। বাতাসে ভাসমান চাঁপার সুবাসের মতোই, আমি তোমাতে বিলীন হতে চাই।
অমল কে? প্রীতি কে? নাহঃ তারা আলাদা কেউ নয়। অমল প্রীতি, অবিচ্ছেদ্য এক অস্তিত্ব। একজন যন্ত্র হলে অন্যজন সুর। একজন তাল হলে অন্যজন ছন্দ। একজন সংগীত হলে অন্যজন নৃত্য। একজন শব্দ হলে অন্যজন কাব্য। একজন নক্ষত্র হলে অন্যজন নক্ষত্র দ্যুতি। একজন অসীম হলে অন্যজন অনন্ত।
কতক্ষণ শাওয়ারে নীচে আমি? ঊহঃ নিশ্চয় অনেকক্ষণ হবে। কতক্ষণ? আধঘন্টা? এক ঘন্টা? কে জানে? ঊহঃ শাওয়ার আমার ভয়ানক এক দুর্বলতা। শাওয়ারে ঢুকলে বেরোতে ইচ্ছে হয় না আমার।
অনেক দেরী হয়ে গেছে বুঝে, তাড়াহুড়ো করে মুহূর্তেই শাওয়ার থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। গা মুছে শাড়ি পরে, আয়নার সামনে দাঁড়ালাম আমি। কে? আয়নায় ওটা কে?
কি নাম গো তোমার? প্রীতি? তোমাকে এতো হাসি খুশি লাগছে কেন আজ? অমল এসেছে বলে? অমল তোমার কে হয় গো? নাহঃ বলবো না। কখনো বলবো না। কেন বলবো তোমায়?
জানো? অমল আমায় ইয়ে হয়। ইয়ে মানে? ধুস, তুমি কি গো? ইয়ে মানেও জানো না? তুমি না একটা... কি? কি আবার! টিকটিকি!
ঠোঁটে লিপস্টিকটা আলতো করে লাগিয়েই, বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। ঘরে ঢুকেই বিছানায় নজর গেলো আমার। এ কি? অমল কি ঘুমিয়ে পড়েছে? লাফিয়ে বিছানার কাছে গেলাম আমি।
তাই তো। অমল তো ঘুমিয়ে পড়েছে। ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসে থাকতে থাকতেই, ঘুমিয়ে পড়েছে অমল। আনন্দের আতিশয্যে, এক প্রকার ভুলেই গেছিলাম আমি, আজই ও আমেরিকা থেকে ফিরেছে। দীর্ঘ পথে ভালো করে ঘুম হয় নি ওর। আজ দুপুরেও, ওকে একটুও ঘুমুতে দিই নি আমরা।
অত্যাচার অত্যাচার! বেচারার উপর কি নিদারুন অত্যাচার। সন্তর্পণে খাটে উঠে, বালিশটা রেডি করে, বিছানায় শুইয়ে দিলাম ওকে। মুখের দিকে চেয়ে মনে হলো, ইশঃ বেচারার এতো ঘুম পেয়েছে, তবুও মুখ ফুটে বলতে পারে নি ও।
ক্যাবলা ছেলে। ভয়ানক এক ক্যাবলা ছেলে। এতো ঘুম পেয়েছে ওর। অথচ ও তা বলবে না? দুপুরেই তো ও, ভালো করে বিশ্রাম করতে পারতো।
সে কি গো প্রীতি? অমলই সব বলবে? কিছুই বুঝবে না তুমি? তুমি না কি, অমলের ইয়ে না কি যেন কি একটা হও!
অমলের মুখের দিকে চেয়ে, বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম আমি। ঘুমের মধ্যেও যেন, ওর একটা হাসি হাসি ভাব আছে। ঘুমের মধ্যেও ও যেন কত সজাগ। সস্নেহ। সবুজ।
খাট থেকে, নেমে নীচে নেমে এলাম আমি। জানলাটা একটু আলতো করে খোলা রেখে, ঘরের আলো নিভিয়ে দিলাম। তারপর খাটের উপর চড়ে, অমলের কপালে ছোট্ট একটা কিস করে, ওর পাশে শুয়ে পড়লাম আমি।
কিন্তু ঘুম এলো না। অমলকে ছুঁতে ইচ্ছে করলো। ওকে গভীর করে ছুঁয়ে, শুতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু ভয় হলো, যদি ঘুম ভেঙে যায় ওর! পরক্ষনেই আবার মনে হলো, ঘুম ভাঙে তো ভাঙুক। একটু আধটু ঘুম ভাঙা দোষের কিছু নয়। আর ঘুম যদি ভেঙেও যায়, তো ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেই, ঘুম এসে যাবে ওর।
তাই? এতো আত্মবিশ্বাস তোমার প্রীতি? হুঁ। আত্মবিশ্বাস না থাকার কি আছে? আমার অমলকে ঘুম পাড়াতে যদি পারবো না, তো প্রীতি নাম কেন আমার?
সন্তর্পণে ওর পাঞ্জাবির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে, ওর দেহের উষ্ণতা অনুভব করার চেষ্টা করলাম আমি। উষ্ণ এক কোমলতা! এ কি শুধুই উষ্ণতা? শুধুই কোমলতা? অথবা আরও বেশি কিছু?
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem