বাবা তারপর অমলের দিকে চেয়ে বললো-
জানো অমল, বড় বিপদ আমার। এদের দুজনের যুদ্ধে, কার পক্ষ আমি নেবো তা এখনো বুঝে উঠতে পারি নি আমি।
কাজেই বাধ্য হয়ে চুপচাপ থাকি আমি।
অমল হেসে বললো-
এ যুদ্ধ অথবা রোমাঞ্চ?
আমি জিজ্ঞেস করলাম
তার মানে?
অমল বললো-
জীবনে বাঁচতে গেলে মাঝে মাঝে FIRE-এর দরকার হয়। তোমাদের যুদ্ধের ধরণ শুনে আমার তাই মনে হচ্ছে।
বাবা-
এটা তুমি দারুন বলেছো অমল। এমন করে তো আগে ভাবি নি।
অমল
রোমান্স, রোমাঞ্চ আর এ ধরণের যুদ্ধের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। They all ignite fire within us. They all keep our lives alive.
খাওয়া দাওয়ার পর কিছুক্ষণ বসার ঘরে বসে আড্ডা দিলাম আমরা। গল্প করতে করতে, রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজলো। অমল হটাৎ সোফা থেকে উঠে, বাবা আর মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
"আমাকে এবার যেতে হবে? "
তারপর অমল আমার দিকে চেয়ে রইলো।
এই চাহনিতে কেমন এক বেদনা আছে। শূন্যতা আছে। অমলের সেই চাহনির বেদনা আমাকে বিদ্ধ করলো। আমার মধ্যেও কেমন এক বেদনা মোচড় দিয়ে উঠলো। অস্ফুটে বলতে ইচ্ছে করলো- "ইশঃ অমলটা এখুনি চলে যাবে? "
অথচ কিছুক্ষণ আগে আমিই বলেছিলাম- ভালোর একটুখানিই ভালো। অমৃত বেশি হলে তারও স্বাদ নোনতা হয়ে যায়। হায়রে মানুষ, কবে তোরা বুঝবি- জ্ঞান এক জিনিস। আর মরণশীল মানুষের হৃদয় অন্য জিনিস। পৃথিবীর মরণশীল মানুষের হৃদয়- গণিতের নিয়ম দিয়ে চালিত হয় না, দর্শনের তত্ত্ব দিয়ে চালিত হয় না। মানুষের ভঙ্গুর হৃদয় সমাজের নিয়ম দিয়ে চালিত হয় না, লাভ লোকসানের বিশ্লেষণ দিয়ে চালিত হয় না।হৃদয় কেবল হৃদয়। একম। অদ্বিতীয়ম। হৃদয় কেবল হৃদয়ের কথা শুনে। ঈশ্বরের কথাও না। মহাবিশ্বের নিয়মের কথাও না।
মনের মধ্যে কোন এক নক্ষত্র হটাৎ জিজ্ঞেস করলো-
"প্রীতি, চাঁদ কেন প্রশান্ততুমি তা জানো? চাঁদ প্রশান্ত তার কারন- চাঁদ একাকী। চাঁদকে ভালোবাসার কেউ নেই। ঝগড়া করার কেউ নেই। আঘাত করার কেউ নেই। চাঁদ পরিত্যক্ত একাকী বলেই সে এতো প্রশান্ত হতে পারে। গৃহীর জীবনে এই প্রশান্তি অসম্ভব। প্রশান্তি পাওয়ার জন্য সাধু আর ঋষিকে তাই গৃহ আর লোকালয় ছেড়ে, দুর্গম গুহার আঁধারে যেতে হয়।
দুর্গম গুহার আঁধারে লুক্কায়িত সাধুরা ভালোবাসাও পায় না। ঘৃণাও পায় না। ভালোবাসা পেলে, ঘৃণা তোমাকে পেতেই হবে। বুকের মধ্যে সুখ জাগলে, বুকের মধ্যে অসুখ জাগবেই। অমলের ক্ষণিকের উপস্থিতি, বুকে তোমার সুখ জাগিয়েছিলো। তাই তার আসন্ন প্রস্থান বুকে তোমার অসুখ জাগাচ্ছে এখন।"
চোখটা আমার ছলছল করে উঠলো। চোখের জল লুকোতে আমি মেঝের দিকে চেয়ে রইলাম।
অমলকেও কেমন যেন নিস্তেজ মনে হলো। ওর ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্য, হটাৎ-ই বিবর্ণ হয়ে গেলো। মনে হলো- ওর দেহ যেতে চাইছে। কিন্তু মন যেতে চাইছে না। কিন্তু যেতে হবে। না অমল পারবে থাকতে। না আমি পারবো, তাকে থাকার জন্য বলতে।
কেন পারবো না? লজ্জাবোধ? ভয়? সমাজের সংস্কার? হয়তো সবগুলোই। মানুষ কি, নিজে নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সমাজের সংস্কার তৈরী করেছে? মানুষ কি নিজে নিজের সুখ আর শান্তিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য সংস্কার তৈরী করেছে? মানুষ কি জানে- তার নিজের গড়া সংস্কার তাকে প্রতি পদক্ষেপে শাস্তি দেয়? তার হৃদয়ের অসীম বিচরণকে খাঁচায় বন্দী করে?
আকাশের পাখি উড়তে পারে। তাই সে আনন্দে তারস্বরে গাইতে পারে। খাঁচার পাখি গাইলেও, সে গানে বেদনা থাকে, ঊচ্ছ্বাস থাকে না। আনন্দ থাকে না। সুখ আর আনন্দ কেবল স্বাধীনতায়। যেখানে স্বাধীনতা নেই, সেখানে সুখ নেই।
কিন্তু আমি তো কোন খাঁচা বা চার দেওয়ালে বন্দী নই। তবে হৃদয় আমার স্বাধীন ভাবে উড়তে পারে না কেন? আমি চাই অমল অন্তত আর একটু থাকুক। কিন্তু আমি তা বলতে পারছি না কেন? আমি কি তাহলে পরাধীন? কোন খাঁচার বাঁধন? আমার ভয়? আমার লজ্জা? সমাজের সংস্কারের প্রতি আমার ভীতি?
হটাৎই মা আমার কাঁধে হাত রেখে, অমলের দিকে তাকিয়ে বললো-
"অমল, এই উইকেন্ডে সময় আছে তোমার? যদি থাকে তো শনিবার সকাল সকাল চলে এসো। অনেক আড্ডা দেবো আমরা। সৃষ্টিকেও ডেকে নেবো আমি।
মা তাহলে আমাদের দুজনের মনের অবস্থা আর body language বেশ বুঝতে পেরেছে। বাবাও হটাৎ বললো-
That's fantastic idea Dhriti.
বাবা অমলের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বললো-
চলে এসো অমল। একটু হৈ চৈ করবো আমরা।
আমি লজ্জা পেলাম। কিন্তু খুশি হলাম। অমলের দিকে তাকিয়ে দেখি, ওর চোখে হাসি।
আমার চোখটাও হেসে উঠলো।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem
আমি লজ্জা পেলাম। কিন্তু খুশি হলাম। অমলের দিকে তাকিয়ে দেখি, ওর চোখে হাসি। A brilliant poem is excellently penned with love and passion...10