উপন্যাস অথবা জীবনের জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি? (Preeti) Poem by Arun Maji

উপন্যাস অথবা জীবনের জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি? (Preeti)

Rating: 5.0

(অমল প্রীতি চরিত্র নিয়ে অরুণ মাজীর আগামী উপন্যাসের অংশ)

নাহঃ দিয়া চ্যাটার্জীর বাবা আমাকে আর ফোন করেন নি। ভেবেছিলাম- ফোন করে হয়তো কিছু খবর দেবে আমায়। কিন্তু আজও কোন খবরই পাই নি। উনি ভীত অথবা সন্ত্রস্ত? সম্ভবত সন্ত্রস্ত। প্রাণের ভয় কার না আছে?

অফিসে বসে, নিউ সিটি থানার ওসিকে ফোন করলাম আমি-
হ্যালো, আমি প্রীতি আচার্য্য বলছি। আমার ডাইরির কেসটা নিয়ে কিছু খবর পেলেন?

থানার ওসি আমার কথা শোনার পর ফোনটা কেটে দিলেন। আবার ফোন করলাম। রিং হলো। কিন্তু কেউ ফোন উঠালো না। বুঝলাম, উনি এ নিয়ে কিছুই করতে চাইছেন না।

কি করি আমি? ব্যাপারটা ভুলে যাবো? আমার মা তো তা-ই চায়। অমল এ ব্যাপারটা নিয়ে সাবধানী। আমাকে বাধা দিতে চায় না। আবার উৎসাহও দিতে চায় না। অমলের মতো সাহসী ছেলেও আমার নিরাপত্তার জন্য চিন্তিত। তো কি করি আমি?

অনেক চিন্তার পর ভাবলাম, যতটা জানি সেই তথ্য দিয়ে মানুষের উদ্দেশ্যে একটা প্রতিবেদন লিখি আমি। লিখলাম-
যুবতীর মৃত্যু অথবা জাতির বিবেকের মৃত্যু?

বলুন তো আপনারা, ইংরেজ শাসন কালে, পরাধীন ভারতে কি সাধারণ মানুষ আজেকের দিনের মতো এতো সন্ত্রস্ত ছিলো? নাহঃ। যারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতো, কেবল তাদেরকেই সন্ত্রস্ত থাকতে হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষকে এতো সন্ত্রস্ত থাকতে হতো না।
স্বাধীনতার অর্থ হলো মুক্ত জীবন। যেখানে মানুষ মুক্ত ভাবে কথা বলতে পারবে, গাইতে পারবে, নাচতে পারবে।

কিন্তু আজকের ভারতে কি হচ্ছে? সত্য কথা বললে তাদেরকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। খুন করা হচ্ছে। মানুষ কি পোশাক পরবে, কত ইঞ্চি স্কার্ট পরবে, তাও স্বঘোষিত রক্ষকরা ঠিক করছে। মানুষকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে হত্যা করা হচ্ছে, কিন্তু সেই হত্যার কোন বিচার হচ্ছে না।

নিহতের বাবা মা পরিবার, বিচার চাইতে গেলে তাদেরকে প্রাণনাশেরহুমকি দেওয়া হচ্ছে। অত্যাচার আর নিপীড়ন করা হচ্ছে। এই হত্যা নিপীড়ন অত্যাচার থেকে শিশু নারী বৃদ্ধ বৃদ্ধা কেউই রেহাই পাচ্ছে না।

আপনারা জানেন, তিন মাস আগে, নিউ সিটির এক ফ্ল্যাটে, দিয়া চ্যাটার্জী নামের এক যুবতীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। সেই যুবতী নাকি ঐসময় দশ সপ্তাহের গর্ভবতী ছিলো। সেই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা' বলে বিবৃতি দিয়ে তদন্ত না করেই দায় সেরেছিলো পুলিশ।

প্রাথমিক ভাবে সেই ঘটনা আপনাদের মনের মধ্যে আলোড়নও জাগিয়েছিলো। কিন্তু এই তিন মাসেই আপনাদের মনের মধ্যেকার সেই আলোড়ন অস্তমিত।

কিন্তু দিয়া চ্যাটার্জীর বাবা মায়ের মনের মধ্যেকার ক্ষত? তা কি কখনো সারবে? দিয়া চ্যাটার্জীর বাবা মা বৃদ্ধ। তারা কর্ম্মহীন। দিয়া চ্যাটার্জী তাদের একমাত্র সন্তান। দিয়াই তাদের মুখে অন্ন তুলে দিতো। এখন ওই বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে দেখবে কে? তাদের এই মানসিক বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়াবে কে?

অভিযোগ এই যে, দিয়া চ্যাটার্জী রাজ্যের এক সিনিয়র মন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো। দিয়াকে নাকি একাধিকবার ওই সিনিয়র মন্ত্রীর সাথে পথে ঘাটে এবং শহরের বিভিন্ন হোটেলে একধিকবার দেখা গেছে।

দিয়ার ফোন রেকর্ড বলছে তার মৃত্যুর আগের এক সপ্তাহে, দিয়া নাকি ঐ সিনিয়র মন্ত্রীকে প্রায় একশোবার ফোন করেছিলো। দিয়া যদি সাধারণ এক মেয়ে, তো সে রাজ্যের এক সিনিয়র মন্ত্রীকে এক সপ্তাহে একশোবার ফোন করবে কেন? দিয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যুর সঙ্গে ঐ সিনিয়র মন্ত্রীর কোন যোগ আছে কিনা, তার তদন্ত হওয়া কি উচিত নয়?

শহরে কানাঘুষো এই যে, অনেকে দিয়া চ্যাটার্জীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন, কোন মানুষের চরিত্র সম্পর্কে সন্দিহান হলেই কি তাকে মরতে হবে? এ কোন নিষ্ঠুর চিন্তাধারা আমাদের?

অভিযোগ এই যে, দিয়া নাকি মৃত্যুর আগে খুন হওয়ার আশঙ্কা করেছিলো, সে কথা সে নাকি তার কাছের বন্ধুদেরওজানিয়েছিলো। এজন্য সে নাকি সবসময় তার বন্ধুদের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছিলো। তবুও তার মৃত্যু ঘটলো।

দিয়া চ্যাটার্জী বাঁচতে চেয়েও বাঁচতে পারে নি। কেন? এতো বড় একটা পুরানো শহর, অথচ এখানে এক যুবতী তার নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেলো না?

এমনও কি হতে পারে, আপনাদের চোখের সামনে ঠিক এই মুহূর্তে এমন অসংখ্য যুবক যুবতী ঘুড়ে বেড়াচ্ছে, যারা প্রাণনাশের ভয়ে সন্ত্রস্ত। তারা এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে, কিন্তু তারা সেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না? তিন কোটি মানুষের এই পুরানো শহর, মরণাপন্ন এক যুবক বা যুবতীকে আশ্রয় দিতে পারে না? তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিৎ করতে পারে না?

তাহলে আপনারা বলুন, আমরা মানুষের পৃথিবীতে বাস করি? অথবা নেকড়ে বা হায়নার গুহাতে বাস করি?

দিয়া চ্যাটার্জীর খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। থানায় ডাইরি করেও আমি কোন সাহায্য পাই নি এখনো। আমাকে আমার পরিবার বন্ধুবান্ধব ইত্যাদি নিষেধ করলেও, আমি কেবল আমার নিজ কর্তব্য বোধের তাগিদে এই প্রতিবেদন আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর, কাল যদি আমার মৃত্যু হয়, তো তাতে আপনার দায় কতখানি? দেশকে নিরাপদ করা কি শুধু সরকারের কর্তব্য? সাধারণ নাগরিকের নয়? সাধারণ নাগরিক যদি অন্যায়কে নীরবে সহ্য করে তো দেশ নিরাপদ হবে কি করে?

প্রতিবেদন- প্রীতি আচার্য্য
© অরুণ মাজী

উপন্যাস অথবা জীবনের জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি? (Preeti)
Wednesday, January 8, 2020
Topic(s) of this poem: love,romance
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success