রোমান্স রাজনীতি নিয়ে অরুণ মাজীর উপন্যাস
ঘুম ভাঙলো বাড়ির গেটের সামনে ভয়ঙ্কর চীৎকার চেঁচামেচি শুনে। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। তড়িঘড়ি করে প্রায় লাফিয়ে বিছানা ছাড়লাম আমি। ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রইং রুমের মধ্য দিয়ে ছুটে যেতেই, আমার সামনে দাঁড়িয়ে বাধা দিলো বাবা। বললো-
"কোথায় যাচ্ছিস? "
আমি
এতো হল্লা হচ্ছে বাইরে, শুনছো না?
বাবা
"তুই এখানেই বোস প্রীতি। পুলিশে খবর দিয়েছি আমি।"
ভয় পেলাম আমি। চাপা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম-
"পুলিশ! কি ব্যাপার বাবা? "
মা, বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। মা আমাকে জিজ্ঞেস করলো-
"আজকের কাগজে, কিছু লিখেছিস তুই? "
কিছু বললাম না আমি। মায়ের মুখের দিকে চেয়ে, গুটিয়ে গেলাম আমি। মা কে বড় উদ্বিগ্ন লাগছে। মুখে কালো ছায়া। মা আমাকে আরও একবার চেয়ে দেখলো। তারপর তিনতলা চড়ার সিঁড়িতে, হতাশ হয়ে বসে পড়লো মা। হাঁটুর উপর কনুই, আর হাতের উপর চিবুক ভর করে, গভীর চিন্তায় ডুব দিলো মা। কিছুক্ষণ এমনি করে থাকার পর, মা আমাকে বললো-
"তোকে কত মানা করেছি প্রীতি। এসব ঝামেলার মধ্যে যাস না।"
বাবা বললো-
"এসব এখন থাক ধৃতি। এ নিয়ে পরে আলোচনা করবো।"
কথাটা বলেই, বাবা আবার একবার থানায় ফোন করলো। উদ্বেগ চেপে রাখার চেষ্টা করলেও, বাবার মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট । বাবাকে, এরকম উদ্বিগ্ন বেশ কম দেখি। তাই আরও ভয় পেলাম আমি।
শুনতে পাচ্ছি, গেটের উপর হাতুড়ির আওয়াজ সমানে চলছে। আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে, ওদের অসম্ভব অশ্লীল গালাগালি আর হুমকি। ওরা কতজন হবে তা জানি না। কিন্তু চীৎকার চেঁচামেচির বহর শুনে মনে হচ্ছে পঁচিশ ত্রিশ জন হবে। বাবা একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বললো-
"দেশের কি অবস্থা! চল্লিশ মিনিট হয়ে গেলেও, পুলিশ এখনো এমার্জেন্সি রেস্পন্স করতে পারলো না।"
এদিকে হুমকি আর অশ্লীল শব্দের বহর বাড়ছে। আমাদের গেটের উপর হাতুড়ির আওয়াজও বাড়ছে। মা-কে আশ্বস্ত করে, বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। বারান্দার কাঁচ না খুলেই, বাইরে উঁকি মেরে দেখলাম- পঁচিশ ত্রিশ জনের অনেক বেশি ওরা। বেশির ভাগই যুবক। অল্প কয়েকজন মধ্যবয়স্ক। এদের অনেকেকেই চিনি আমি। এরা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক। পাড়ার মিটিং মিছিলে, এদেরকে প্রায়ই দেখা যায়। অবাক হলাম এই দেখে যে, এদের কয়েকজন আমার বাবার পেসেন্ট।
খুব রাগ হলো আমার। এদের কাউকে কাউকে, বাবা দুর্দিনে অনেক সাহায্য করেছে। কিন্তু রাজনীতির পচা জল খেয়ে, এরা আজ অন্ধ বিকলাঙ্গ। ভাবলাম- মানুষ কত নির্লজ্জ নিমকহারাম হতে পারে! মানুষ কত মস্তিস্কহীন হৃদয়হীন হতে পারে!
এরই মধ্যে শুনতে পেলাম, কয়েকটা পাথর আমাদের দেওয়াল আর বারান্দার কাঁচে আঘাত হানলো। তখুনি আমার ঘরের মধ্যে ফিরে এলাম আমি। খাটের একদিকে ঠেসে দিয়ে দাঁড়িয়ে, অমলকে ফোন করলাম। অমলকে ঘটনার কথা বললে- ও নীরবে তা শুনে গেলো। আমার কথা শেষে, ও আমাকে বললো-
"তোমরা কোন রিয়্যাকশন করো না। পুলিশ আসার জন্য অপেক্ষা করো। দেখছি- কাউকে আমি খুঁজে পাই কিনা। "
একটু আশ্বস্ত হলাম আমি। জানি, অমলের বাবা বিহার ক্যাডারের আই এ এস অফিসার ছিলেন। পুলিশ আর আই এ এস মহল, ওদের বেশ পরিচিত।
আরও আধঘন্টা কেটে যাওয়ার পর মনে হলো, ওদের চীৎকার চেঁচামেচি হটাৎ যেন কমে এলো। বারান্দা থেকে আমরা উঁকি মেরে দেখলাম- পুলিশের দুটো গাড়ি। দেখলাম- কয়েকজন পুলিশের সাথে, উত্তেজিত হামলাকারীদের তর্কাতর্কি চলছে। এবার একজন পুলিশ উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করলেন-
"শুনুন, আপনাদের কিছু বলার থাকলে আপনারা তা থানায় জানান। বা আদালতের দ্বারস্থ হউন। কিন্তু কারও বাড়ির গেট ভাঙার চেষ্টা করা, বা তার বাড়ির মধ্যে পাথর ছুঁড়া অপরাধ।"
উত্তেজিত জনতা তবুও তর্ক করার চেষ্টা করলো। পুলিশ অফিসারটি তখন বললেন-
"আপনারা শান্তভাবে এ জায়গা ত্যাগ না করলে, আপনাদেরকে এরেস্ট করতে বাধ্য হবো আমি।"
হামলাকারীরা অশ্লীল রকম গালাগালি করতে করতে, পিছু হটতে লাগলো। ওর সবাই চলে না যাওয়া পর্যন্ত, পুলিশের দল অপেক্ষা করলো। তারপর একজন পুলিশ, আমাদের গেটের কলিং বেল বাজালেন। বাবা নীচে নেমে গেলো। গেট খুলতেই, ওদের একজন পরিচয় দিয়ে বললেন-
"নমস্কার, থানার ওসি আমি।"
বাবা ওনাকে প্রতি নমস্কার করলো। দেখলাম পুলিশের গাড়ির পিছনে আরও একটা গাড়ি। সেই গাড়ি থেকে একটি যুবতী মেয়ে বেরিয়ে এলেন। উনি থানার ওসিকে কিছু বললেন। তারপর ওসি আর মেয়েটি বাড়ির ভিতর ঢুকলেন।
বাবা ওনাদেরকে আমাদের ড্রয়িং রুমে নিয়ে এলো। ওসি আমার দিকে চেয়ে দেখলেন। তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন -
"খামোকা আপনারা নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন কেন? "
আমি বলতে গেলাম-
তো আপনারা তাহলে কি করছেন?
কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই, উনি বললেন-
"এমন নয় যে পুলিশ কিছু করতে চায় না। পুলিশ তার কাজ করতে চাইলেও, পুলিশ তা পারে না। রাজনীতির জালে আমরা পঙ্গু।"
এবার বাবার দিকে চেয়ে, উনি জিজ্ঞেস করলেন-
"আপনি কি এ ব্যাপারে অভিযোগ লেখাতে চান? "
বাবা আমার দিকে চেয়ে বললো-
"প্রীতি, তুই একটা অভিযোগ লিখে দে।"
ওসি তার গাড়ি থেকে ডাইরির বই আনিয়ে নিলেন। অভিযোগ লিখলাম আমি। অভিযোগ লেখা শেষ হলে, ওসি চলে যাওয়ার জন্য উঠলেন। যাওয়ার সময় উনি বলে গেলেন-
"একটু সাবধানে থাকবেন আপনারা। যতটা পারি, আপনাদের উপর নজর রাখবো আমি।"
পুলিশ চলে গেলে, সাংবাদিক মেয়েটি আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
"আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি? "
আমি বললাম-
"যা ঘটলো আপনি তা দেখলেন। আর যে জন্য এ ঘটনা ঘটেছে, তা বোধহয় আপনি পড়েছেন।"
সাংবাদিক
"হুঁ। রাস্তায় আসতে আসতে তা পড়লাম।"
উনি এবার বাবার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
"ডাইরির কপির, একটা ফটো নিতে পারি? "
বাবা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লো। উনি মোবাইল ফোনে, ডাইরির কপির ফটো তুলে, নীচে নেমে গেলেন। বাবা ওনার পিছু পিছু গিয়ে, বাড়ির গেটটা আবার বন্ধ করে দিলো।
মা এবার আমার দিকে চেয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বললো-
"তোদের কারও আজ, বাড়ির বাইরে বেরোনার দরকার নেই।"
বাবা মাকে বললো-
"ও যে ভুল করেছে, তা তুমি ভাবছো কেন? "
মা বললো-
"ঠিক কাজও বুঝে করা উচিৎ। আমরা এই যে বিপদে পড়লাম, তো পাড়ার কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখলে? "
বাবা বা আমি, কিছুই বললাম না আমরা। মা আরও রেগে গেলো। ক্ষুব্ধস্বরে বললো-
"যে সাধারণ মানুষের কথা ভেবে তুই এ কাজ করলি, তারাই এখন দূর থেকে তামাশা দেখলো।"
আমি মা-কে বললাম-
তুমিই তো আমাকে সাহসী হতে বলো।
মা-
"হ্যাঁ বলি। কিন্তু? "
আমি-
কিন্তু কি?
মা-
"তুই এখন টেবিলে বোস। আমি ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছি।"
বুঝলাম, মা নিজেই সংঘাতগ্রস্ত। তাই আমার কথার উত্তর না করে, কথার মোড় ঘুরিয়ে দিলো। আমি হাসলাম। বাবা তা নজর করলো। বাবা আমার দিকে চেয়ে বললো-
"ঠিক ভুল নির্ণয় বড় গোলমেলে ব্যাপার প্রীতি। তার উপর, একমাত্র সন্তানের নিরাপত্তার ভয় যদি থাকে, তো ঠিক কাজকেও তখন ভুল মনে হয়।"
বাবার কথা শুনে মনে পড়ে গেলো, অরুণ মাজীর সত্য যোদ্ধা কবিতার কিছু লাইন-
সত্য বড় একা।
অসহায়। অবসাদগ্রস্ত।
রাতদিন এতো মিথ্যার খঞ্জনি
মিথ্যাচারীর সংঘবদ্ধ কীর্তন-
মিথ্যাকেই সত্য মনে হয়।
দেখলাম- বাবা, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কাগজ পড়তে শুরু করলো। কাগজে, আমার লেখাটা খুঁজে, সেটা বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়লো। তারপর প্রায় ধরা গলায় বললো-
"আঁধারে ঢাকা এ পৃথিবী, প্রীতি। এই পৃথিবীর অন্ধকার এতো গাঢ়, ছোট ছোট প্রদীপগুলো একদিন, জ্বলতে ভুলে যায়।"
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem