আলো আঁধার ছায়া খন্ড ১৪ খ (Preeti) Poem by Arun Maji

আলো আঁধার ছায়া খন্ড ১৪ খ (Preeti)

রোমান্স ও রাজনীতি ভিত্তিক অরুণ মাজীর উপন্যাস

আমি কোন উত্তর দেওয়ার আগেই, মা আমার উদ্দেশ্যে বললো-
"বড় হয়েছিস। এবার বিয়ে করে ঘর সংসার কর।"

বাবা কিছুটা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো-
"Good idea. I suggest that too. Work is important. But personal life is more important. We all must dance while we still have young bones."

বাবা মা আমাকে, বিয়ের কথা এর আগেও অনেক বলেছে। পাত্তা দিই নি আমি। বাবা মায়ের কথা, তখন তত বেশি সিরিয়াস শোনায় নি। আজ কিন্তু ওনাদেরকে বেশ সিরিয়াস শোনাল। বিশেষ করে বাবার বলার ভঙ্গী বেশ দৃঢ় আর গম্ভীর আজ। বাবার এই দৃঢ় মন্তব্যে, একটু ঘাবড়ে গেলাম। কোন উত্তর না করে চুপ রইলাম আমি।

আমার হাতে, ফিস কাটলেটের প্লেট ধরিয়ে দিয়ে মা বললো-
"এগুলো তোরা খেতে থাক। আমি বরং রান্নাটা সেরে নিই।"

মা তারপর বাবার দিকে চেয়ে বললো-
"অমল দারুন ছেলে। তাই না? তুমি কি বলো? "

বাবা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করলো-
"I like him. He is brave, honest."

বাবার কথা শুনে, মা আমার দিকে চেয়ে হাসলো। বাবাও আমার দিকে চেয়ে হাসলো। আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে, ওনাদের এই আলোচনা যে বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অস্বস্তি অনুভব করলাম আমি। দ্রুত পালাতে চাইলাম আমি। মা বাবার উদ্দেশ্যে বললাম-
আমি এখন আসছি।

মা আমার কামিজের প্রান্ত ধরে টেনে ধরলো। বললো-
যাচ্ছিস কোথায় তুই? শুনলি তোর বাবা কি বললো?

মায়ের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম-
আমি আসছি।

দ্রুত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। দেখি, অমল এখনো নীচে নামে নি। তাই ফিস কাটলেটের প্লেট হাতে নিয়ে, উপরে উঠে এলাম আমি। দেখলাম- অমল সবে তার বোতাম লাগানো শেষ করেছে। আমাকে দেখে বললো-
"অনভ্যাস প্রীতি, সবই অনভ্যাস। যে কাজটা কয়েক মিনিটে করা দরকার ছিলো, সেটা করতে কুড়ি মিনিট লাগিয়ে ফেললাম।"

ফিস কাটলেটের প্লেটটা পড়ার টেবিলে রেখে, অমলের দিকে হেসে বললাম-
দেখি দেখি, কেমন বোতাম লাগিয়েছো তুমি?

অমল বললো-
"Don't worry. আজকের মতো উতরে গেলেই হলো। বাড়িতে গিয়ে মাকে বলবো, মা সব ঠিক করে দেবে।"

আমি
তোমার মা যদি জিজ্ঞেস করে, কেমন করে হলো এটা?

অমল
"বলবো, ছিঁড়ে দিয়েছো তুমি।"

আমি
বলতে পারবে এ কথা?

অমল
"কেন? না বলার কি আছে? তোমার মতো সুন্দর এক ফুলকে kiss করেছি আমি। তো এ কথা লুকানোর কি আছে? "

আমি
তুমি পারবে এ কথা বলতে?

অমল
"তুমি না চাইলে আলাদা কথা। নইলে, আমার বলতে কোন আপত্তি নেই।"

আমি
বেশ, তুমি সাহসী। এবার মায়ের তৈরী ফিস কাটলেট খাও তুমি।

ফিস কাটলেটে কামড় দিতে দিতে, আমরা নীচে নেমে এলাম। বসার ঘরে না এসে, অমল সোজা রান্না ঘরের দিকে চলে যেতে চাইলো। আমার দিকে চেয়ে বললো-
আমি বরং, তোমার বাবা মায়ের সাথে, রান্নাঘরে গিয়ে কথা বলে আসি।

অমল রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো। আমি সোফাতে বসে ফিস কাটলেট খেতে খেতে ভাবলাম- অমলের মধ্যে সরলতা আছে। স্বাভাবিক এক স্বাচ্ছন্দ্য আছে। ভয় সংস্কার ফর্মালিটি, ইত্যাদির তোয়াক্কা করে না ও। সোফাতে বসে ফিস কাটলেট খাচ্ছি আমি। এক মিনিটের মধ্যে, রান্নাঘর থেকে ওদের তিনজনের হো হো হাসি ভেসে এলো। বুঝলাম- অমল মুহূর্তেই "সব সেট" করে ফেলে আছে।  

আমার মা বাবাও, আমাকে তাই হতে উদ্বুদ্ধ করে। ওনারা বলে- মানুষের মধ্যে, নমনীয়তা আর দৃঢ়তা দুইই থাকতে হবে, সারল্য এবং সৌন্দর্য্য দুইই থাকতে হবে। কাঁচা লোহা কেবল শক্ত, কিন্তু নমনীয় নয়। পাকা লোহা শক্ত, আবার নমনীয়। শুধু দৃঢ়, বা শুধু নমনীয় হলে চলবে না।

ফুল অনাবৃত সরল, তবুও সুন্দর। ফুলের কোন আবরণ বা আভরণ নেই। নগ্ন দেহেই ফুল সুন্দর। ফুল তার অন্তরের সহজাত গুণে সুন্দর।

মানুষের চরিত্রে কিন্তু এই সংমিশ্রণ এতো সহজ নয়। এজন্য মানুষের চরিত্রে দরকার, সাহস সততা দয়া মায়া ভালোবাসা- সবকিছু।

এই ব্যাপারটা,  এখনো বেশ গোলমেলে আমার কাছে। আমি ভাবি, মানুষ একসঙ্গে নমনীয় আর দৃঢ় হবে কি করে? কিন্তু বাবা বলে-
You must live with a greater purpose. That purpose would guide you when to be strong and when to be accommodating. If you live with a purpose, you would find your direction. Then you would not be distracted by noise and temptation.

রান্নাঘর থেকে আবার, বাবা মা অমলের হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। আমার কৌতূহল হলো। আমিও রান্না ঘরে ছুটে গেলাম। দেখলাম- অমল, তেঁতুল ধনিয়াপাতার চাটনি বানাচ্ছে। মা, মাংস রান্না করছে। আর বাবা, চাল ধুয়ে ভাত চড়াচ্ছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ওদের তিনজনকে পরখ করে দেখতে থাকলাম আমি। আমাকে দেখে, অমল ওর কোর্টটা খুলে, আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো-
"দেখলে? একটু আধটু রান্না আমিও জানি।"

মা বললো-
"একটু আধটু নয়, তুমি বেশ ভালোই পারো। তোমার চাটনির রঙ তা বলে দিচ্ছে।"

বাবা উঁকি মেরে, অমলের কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো-
"হ্যাঁ তাইতো। তুমি তো বেশ বানিয়েছো অমল। "

আমিও উঁকি মেরে দেখলাম। আমাকে উঁকি মারতে দেখে, অমল মৃদু একটু হাসলো। আমিও ওর দিকে আড়চোখে চেয়ে, একটু হাসলাম।

রান্না শেষে অমল আমাকে জিজ্ঞেস করলো
"I want to take a shower? May I use your shower please? "

কিছু বলার আগেই মা বললো-
"সেই ভালো। "

মা তারপর বাবার দিকে চেয়ে বললো-
"তুমি বরং, তোমার জামা কাপড় অমলকে দাও। বেচারা ঘামছে।"

অমলের চাটনি রান্না শেষ হলে, ও আর আমি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ওর উদ্দেশ্যে বললাম আমি-
তুমি আমার ঘরে যাও। আমি তোমার জামা কাপড় নিয়ে আসছি।

অমল উপরে চলে গেলো। মায়ের ঘরে ঢুকে, ওয়ার্ডরোব থেকে, বাবার পাজামা পাঞ্জাবি বের করলাম আমি। তারপর সেগুলো নিয়ে উপরে উঠে এলাম। উপরে উঠে দেখলাম- দরজা খোলা। তবুও সাড়া দিলাম আমি-
ঘরে আসবো?

বাথরুম থেকে অমলের আওয়াজ ভেসে এলো-
হ্যাঁ, ওগুলো তুমি বিছানার উপর রেখে দাও।

পাজামা পাঞ্জাবি বিছানার উপর রেখে, নীচে নেমে এলাম আমি। দেখি, মা তখন খাওয়ারগুলোকে, ডাইনিং টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখছে। মাকে সাহায্য করতে, আমিও খাওয়ারগুলো, রান্নঘর থেকে বয়ে এনে, ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম।

অমল নীচে নেমে এলো এবার। অমলকে বেশ অন্যরকম লাগছে। টিপিক্যাল ব্যাঙালী পুরুষের মতো। ওকে আমি এর আগে; জিন্স, শার্ট বা টি শার্টের উপর, কোর্ট পরতেই শুধু দেখেছি। পাঞ্জাবী পরতে আগে দেখিনি। জিন্স টি শার্ট আর কোর্টেই, বেশি সাবলীল লাগে ওকে।

আমার একটু কাছে এলো অমল। মুহূর্তেই সুন্দর সুগন্ধ নাকে ভেসে এলো। বুঝলাম- ও আবার আমার পারফিউম ব্যবহার করেছে। নীচের ঠোঁট দাঁত দিয়ে কেটে, ওর দিকে চেয়ে হাসলাম আমি।

অমলও হাসলো। বললো-
সরি, তোমাকে না জিজ্ঞেস করেই তোমার পারফিউম ব্যবহার করেছি।

আমি বললাম
It's ok.

"Thank you."

আমরা যখন খাচ্ছি, অমলের ফোন বেজে উঠলো হটাৎ। অমল ফোন ধরলো-
"না মা, ব্যাঙ্গালোর যাওয়া হয় নি। আমি এখন প্রীতিদের বাড়িতে।"
"হ্যাঁ। ব্যাঙ্গালোর যাওয়া ক্যান্সেল করলাম। কাল বা পরশু যাবো ওখানে। "
"তুমি চিন্তা করো না। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফিরছি আমি।"

বুঝলাম অমল ওর মাকে জানায় নি, ও ব্যাঙ্গালোর যাওয়া ক্যান্সেল করেছে।  অমল আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
ইশঃ ভুলেই গেছি মাকে ফোন করতে।

আমি কিছু বললাম না। মা বললো-
তোমার ফোন পায় নি বলেই উনি ফোন করেছেন।

অমল অপরাধীর মতো মাথা নামিয়ে নিলো। ওর অস্বস্তি কাটাতে, বাবা বললো-
তোমার তৈরী চাটনি কিন্তু বেশ হয়েছে অমল।

অমল হাসলো। বললো-
Thank you.

খাওয়া দাওয়া শেষে, সোফায় বসে কিছুক্ষণ আড্ডা মারলাম আমরা। জমিয়ে রসমালাই আর কালোজাম খেলাম। অমল উঠার ইঙ্গিত করতে, মা বললো-
"তোমার জামা কাপড় এখানেই থাক। আমি ধুয়ে রাখবো।"

বাবা মা, দরজা পর্যন্ত অমলকে বিদায় জানাতে এলো। মা আমাকে বললো-
"তুই বরং অমলকে গাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে আয়।"

গাড়ির কাছে পৌঁছলে, অমল আমাকে গাড়ির কো পাইলট সিটে বসতে ইশারা করলো। অমল গাড়ির দরজা খুলে ধরলে, একটু ইতস্তত করে গাড়ির মধ্যে বসলাম আমি। অমল গাড়ির ড্রাইভার সিটে বসে গাড়ির কাঁচগুলো পরখ করলো। তারপর আমার দিকে চেয়ে, ওর ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে তাকে kiss করার ইঙ্গিত করলো। আমি হাসলাম। কিছু বললাম না।

অমল আবার একবার ইঙ্গিত করলো। আমি হেসে, আমার ঠোঁট দিয়ে ওর ঠোঁট স্পর্শ করলাম। অমল ওর বাঁ হাত আমার ঘাড়ের পিছনে রাখলো। আর ডান হাত দিয়ে আমার চিবুক ধরে আমাকে locked lips অবস্থায় চেপে ধরলো। আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম-
ব্যাস। bye for now.

"bye."

ছোট্ট কথা। তবুও বুকটা যেন কেঁপে উঠলো আমার। ইশঃ অমলটা আবার চলে যাবে। আমার জন্য, বেচারা ব্যাঙ্গালোরের ফ্লাইট মিস করলো আজ। তবুও, এখুনিই ওকে চলে যেতে হবে।

ভারী বুকে, গাড়ির দরজা খুলে, অমলের জানালার পাশে, রাস্তায় দাঁড়ালাম আমি। অমল আমার দিকে তাকিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলো। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দের সাথে সাথে, বুকটা বেজে উঠলো আমার। অমলের চোখের হাসিতে, কালো মেঘ এখন।

অমলের গাড়ি কয়েক পা এগিয়ে গেলো। তারপর মুহূর্তের জন্য একটু থামলো মনে হলো। তারপর আবার এগিয়ে গেলো। গাড়িটা অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত, অপলকে চেয়ে রইলাম আমি।

বৃষ্টি! এখন বৃষ্টি? গালে হাত দিয়ে দেখলাম- কয়েকফোঁটা জল। হায়রে, মেঘ জমেছে চোখে। অমলকে ছেড়ে থাকার দুঃখ দিয়ে তৈরী, ঘন কালো মেঘ। প্রীতির হৃদয়ে বৃষ্টি।  আর অমলের? বেচারা অমল! আমার অমল! ভালোবাসলে, এতো ব্যথা ভুগতে হয় কেন, হে ঈশ্বর?


© অরুণ মাজী

আলো আঁধার ছায়া খন্ড ১৪ খ (Preeti)
Friday, July 3, 2020
Topic(s) of this poem: love,romance,romantic
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success