সিডনি ভীষণই মাল্টিকালচারাল শহর। পৃথিবীর সব দেশের মানুষ আসে এখানে। এই সিডনিতে ডাক্তারি করতে গিয়ে, পৃথিবীর ভয়ঙ্কর সব বুদ্ধিমান মানুষদের সম্মুখীন হই আমি। নেতা অভিনেতা শিল্পপতি বিজ্ঞানী দার্শনিক ইকোনোমিস্ট- কে নেই এই লিস্টে?
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানো? এইসব শক্ত সমর্থ ক্ষমতাশালী মানুষদের সাথে কথা বলে মনে আমার হয়েছে-
তাদের সাথে আমার গাঁয়ের পেন্তীর মায়ের, খুব বেশি তফাৎ নেই। আমরা সকলেই একই রকম ঘেঁটে ঘ।
সকলেই কাঁদে। কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদে। কেউ গলা ছেড়ে কাঁদে। কিন্তু কাঁদে।
সকলেই হাসে। কেউ মিচকি হাসে। কেউ ছেঁচকি হাসে। কিন্তু হাসে।
সকলেই ছড়ায়। কেউ এলোপাথাড়ি ছড়ায়। কেউ সাজিয়ে গুছিয়ে ছড়ায়।
সকলেই কান্না লুকোয়। আবার সকলেই হাসে দিয়ে কান্না ঢাকে।
সকলেই পশু। কেউ অরুণ মাজীর মতো উলঙ্গ পশু। কেউ নামাবলী বা আলখাল্লার আড়ালে পশু।
কেন? নেতা অভিনেতা শিল্পপতি বিজ্ঞানী দার্শনিক ইকোনোমিস্ট ইত্যাদির মতো তাবড় তাবড় মানুষও, ছড়িয়ে তাদের জীবন লাট করে কেন?
আমার ডাক্তারি বিদ্যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হলো- যত বড় বৈজ্ঞানিক ও বিচার বুদ্ধির মানুষ তুমি হও না কেন, তোমার আবেগ- তোমার যুক্তিবোধকে গলা টিপে মারবেই মারবে। একশো ভাগ সময় নয়। সম্ভবত নিরানব্বই ভাগ সময়।
আবেগ আর যুক্তি বোধের দ্বন্দ্বে- আবগেই জেতে অনেক অনেক গুণ বেশি। এজন্যই দেশের প্রেসিডেন্টও, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ম্যাকডোনাল্ড-এর মতো জাঙ্ক ফুড কিনে খান। এজন্যই একজন বিশ্ববিখ্যাত অভিনেতা, তার বিশ্ববিখ্যাত অভিনেত্রী স্ত্রীর উপর সর্ব্ব সমক্ষে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। বিজ্ঞাপন জগতের সাফল্য মানুষের এই আবগেকে সুড়সুড়ি দিয়ে। পৃথিবীর রাজনৈতিক নেতাদের সাফল্যও, মানুষের অন্ধ আবেগকে সুড়সুড়ি দিয়ে।
মানুষের মধ্যে পশুত্ব প্রবল পরাক্রমী।
কিন্তু শিল্প কল্পনা বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন মনুষত্ব বেশ দুর্বল। এজন্যই এই পৃথিবী আজও এতো হিংস্র আর দাঙ্গাপূর্ণ। বড় হতাশাজনক বাস্তব। তাই না? সত্যিই হতাশাজনক।
মানুষের মধ্যে বিদ্যমান প্রবল পরাক্রমী এই পশুত্বকে খাঁচায় বন্দী করার সহজ উপায় যেদিন আমরা আবিষ্কার করবো, সেদিন কিন্তু এই পৃথিবী বেশ সুখ আর শান্তিময় হবে।
ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভাবি, কিন্তু এখনো পর্যন্ত বেশি দূর এগোতে পারি নি। (এজন্যই আমি নোবেল প্রাইজ থেকে এখনো ১ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। আমি মরার সময় ব্যবধানটা হয়তো একটু বেশিই হবে।)
হিন্দু দর্শনে জোনাকির মতো মিটমিট করে জ্বলতে থাকা কিছু আলো আছে, কিন্তু এই পার্থিব জগতের পরাক্রমী কৃত্রিম আলোর কাছে জোনাকি তার আলো হারিয়ে ফেলে। লক্ষ লক্ষ নেকড়ের গর্জনের সামনে বাঁশের বাঁশির সুর কখনো ফুটে কি? (হ্যাঁ হিন্দু দর্শন। আমি কিন্তু হিন্দু সংস্কারের কথা বলছি না।)
তোমরা যারা আমার লেখা নিয়মিত পড়ো, তারা মাঝে মধ্যে জোনাকির সেই আলো মুহূর্তের জন্য অনুভব করেছো। কিন্তু তা তোমাদের মনে, খুব একটা দাগ কাটে না। কেন? কারন- লক্ষ লক্ষ নেকড়ের গর্জনের সামনে বাঁশের বাঁশির সুর কখনো ফুটে না।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem
You are a dishonest man thieving popularity.