উত্তরণ খন্ড ৩ (Trishna) Poem by Arun Maji

উত্তরণ খন্ড ৩ (Trishna)

হাসতে হয়, সকলকেই হাসতে হয়।
চোখে, বেদনার অশ্রু নিয়ে হাসতে হয়
মনে, ক্রোধের আগুন নিয়ে হাসতে হয়
হৃদয়ে, যন্ত্রণার পাহাড় নিয়ে হাসতে হয়
আত্মায়, স্মৃতির আর্তনাদ নিয়ে হাসতে হয়।

বুক ফেটে চৌচির হলেও, হাসতে হয়
হাসতে গিয়ে কেঁদে ফেললেও, হাসতে হয়।

মাঝে মাঝে ভাবি, জীবনটা কি তবে অভিনয়? জীবনটা কি তবে  সঙ সেজে অভিনয় করার  তরে? হয়তো হ্যাঁ। বা নয়তো না।

হ্যাঁ এজন্য যে, মানুষ যা চা চায় না, কখনো কখনো মানুষকে তা করতে হয়। অনেক সময়, মুখে হাসি নিয়েই তা করতে হয়।

না এজন্য যে, জীবনের অনন্ত প্রবাহে মানুষ ছোট্ট এক কাঠের টুকরো। জীবনের ধারা অনন্তকাল ধরে বইছে। আজ আমি আছি। কাল অন্য কেউ আসবে। ছোট্ট কাঠের টুকরোর জন্য, অনন্ত এক প্রবাহ নিজেকে বদলাবে না। ছোট্ট কাঠের টুকরোকেই, প্রবাহের স্রোত অনুযায়ী ভাসতে হবে। আর স্রোত মানেই জোয়ার ভাঁটা। চড়াই উৎরাই। উত্তাল তরঙ্গ।

কাজেই মানুষের চাওয়া পাওয়া বড় কথা নয়। জীবনের প্রবাহ মানুষকে যা দেবে, মানুষকে তাই গ্রহণ করতে হবে।  

তো কি অসম্ভব যন্ত্রণা মানুষের! তাই না? মানুষের বুক ফাটলেও, তাকে অভিনয় করে হাসতে হয়। অন্তরে রক্তাক্ত হলেও, মানুষকে শক্ত সাজতে হয়!  

আমার মা তো তাই করছে। হৃদয়ে অশ্রু নিয়ে, সারা জীবন হেসে গেলো মা। চৈতি কাকীমাও তাই। বুকে কষ্ট নিয়ে, সারা জীবন হেসে গেলো। কর্ণেল সিংও তাই। হৃদয়ে শূন্যতা নিয়ে, সারা জীবন হেসে গেলো।

ওহে অমল, বুক ছুঁয়ে তুমি বলো তো- তুমিও কি, সেই একই অভিনয় করছো না? তুমি কি জানতে না- তৃষ্ণা দূরে চলে গেলে, বুক ফেটে চৌচির হবে তোমার? তবুও তুমি শক্ত সাজতে গেলে! তোমার বুক ফেটে চৌচির হবে জেনেও, তুমি শক্ত সাজতে গেলে।

তৃষ্ণা, কোথায় তুই? তোর আমাকে মনে পড়ে? আমার জন্য কষ্ট হয় তোর? কষ্ট যদি হয়, তো আমায় ছেড়ে গেলি কেন? বল, গেলি কেন?

তোরও ঠিক আমার মতো অভিনয়? তাই না? বুক ফাটবে জেনেও, তুই শক্ত সাজতে গেলি।

ওহে মানুষ, কখনো কি ভেবেছো, কেন তুমি নরম মাংস আর তরল রক্ত দিয়ে তৈরী? কেন তুমি পাথর দিয়ে তৈরী নও? কেন তুমি ধাতু দিয়ে তৈরী নও? কারন- ঈশ্বর চায় না, তুমি শক্ত হও। ঈশ্বর চায় তুমি নমনীয় হও। ঈশ্বর যদি চায় না তো শক্ত সেজে নিজের যন্ত্রণা বাড়াও কেন তুমি?

মানুষের জীবনের অর্দ্ধেক যন্ত্রণা, শক্তের ভূমিকায় তার অভিনয়ের জন্য। তার বুক ফাটবে, তবুও সে মুখ খুলবে না। যন্ত্রণায় রগড়ে রগড়ে মরবে, তবুও মানুষ ঔদ্ধত্যের মুখোশ খুলবে না। মানুষ নরম মাংস আর তরল রক্ত দিয়ে তৈরী হলেও, নমনীয় সে হবে না। মানুষ, নির্বোধ নটঙ্কী অহঙ্কারী জীব।  

কয়েকটা মুহূর্ত, কয়েকটা দিন হয়ে গেলো। কয়েকটা দিন, কয়েকটা সপ্তাহ হয়ে গেলো।  কয়েকটা সপ্তাহ, কয়েকটা মাস হয়ে গেলো। কয়েকটা মাস, কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে গেলো। কয়েকটা স্মৃতি বুকের গহনে কয়েকটা অশ্রুত কাব্য হয়ে গেলো।

আমি কাঁদছি! কাঁদছি কেন? কাঁদতে তো আমি চাই না। তৃষ্ণা আমার হৃদয়ে, তো আমার দুঃখ কোথায়? আমার তো দুঃখ নেই! তৃষ্ণা তার নগ্ন বুকে, আমার স্পর্শ আহ্বান করেছে। তৃষ্ণা এক বুকে তৃষ্ণা নিয়ে আমাকে চেয়েছে। তো আমার দুঃখ কোথায়?

আমার হৃদয় পূর্ণ, আমার স্বপ্ন পূর্ণ, আমার জীবন পূর্ণ।

তবুও এতো পূর্ণতা মাঝে, এতো শূন্যতা কেন? এতো প্রাপ্তি মাঝে, এতো অপ্রাপ্তি কেন? এতো ভরা প্লাবনে, এতো খরা দুর্ভিক্ষ কেন? এতো আনন্দ মাঝে, এতো হাহাকার কেন?

কে তুমি মায়াময়? কে তুমি অন্তরীক্ষ নিবাসী? কে তুমি ভাগ্যচক্র হাতে অদৃশ্য মহাদেবতা? কে তুমি সত্যম শিবম সুন্দরম? কে তুমি অদৃশ্য? কে তুমি দ্বৈত মাঝে অদ্বৈত?  

দ্বিত্ব দ্বিত্ব দ্বিত্ব। এই দ্বৈত্যের ঘূর্ণি থেকে মানুষের পরিত্রাণ নেই। মানুষ খুঁজে পেলে, হারাবে। আর হারালে, আবার খুঁজে পাবে। তৃষ্ণা এসেছে, তৃষ্ণা যাবেই। তৃষ্ণা গেছে। তৃষ্ণা আসবেই।

তৃষ্ণা আসবেই। চোখে আমার, হাসি খেলে গেলো। হৃদয়ে আমার, প্রশান্তির স্রোত বয়ে গেলো। স্বপ্নে আমার, রামধনু উড়ে গেলো।

কিন্তু কবে আসবে? কবে? তিন মাস, চার মাস, পাঁচ মাস....... বারো মাস? বারো মাস কত দূরে? খুব দূরে নয়। বারো মাস, মাত্র বারো সমুদ্র চোখের জল দূরে। তিনটে তো কবেই পার করে দিয়েছি। আর না হয়.....

© অরুণ মাজী

উত্তরণ খন্ড ৩ (Trishna)
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success