শূন্যে ভেসে ভেসে হাঁটছি আমি। খুব দ্রুত। চারিদিকে মৃদু আলো। নীচে পাহাড় পর্বত নদী জমি বাগান। আর উপরে অসংখ্য নক্ষত্র।
চারপাশের এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে, আরও বেশি উল্লসিত হয়ে উঠছি আমি। উৎসাহের বশে, আরও জোরে হাঁটতে শুরু করলাম আমি। কিন্তু জোরে হাঁটতে শুরু করতেই......
অনুভব করলাম, বিছানায় শুয়ে আমি। তখুনি বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম আমি।
এই একই ধরণের স্বপ্ন বারবার কেন দেখি আমি? পৃথিবী আর নক্ষত্রের মাঝে যে মহাশূন্যতা, সেই শূন্যতার মধ্যে হাঁটছি কেন আমি? হাঁটতে হাঁটতে এতো উল্লসিত কেন আমি?
এই প্রশ্নের উত্তর বারবার খুঁজেছি আমি। কিন্তু উত্তর এখনো পাই নি। কেন পাই নি?
হটাৎ নজর গেলো, জানালার দিকে। তাকিয়ে দেখি, মৃদু সূর্যের আলো ঢুকছে।
সকাল হলেও, বিছানায় বেশ কিছুক্ষণ এমনি করে পড়ে রইলাম আমি। ভাবলাম-
এই শেষ দুমাস, কেমন যেন এক নেশার মধ্যে কেটে গেলো। সকাল সাড়ে চারটের সময় ঘুম থেকে ওঠা, ছ-টার সময় এক ঘন্টার PT, আটটার সময় থেকে তিন ঘন্টার ড্রিল। আর তারপর আবার চারঘন্টার লেকচার।
বিকেলেও আমাদের মুক্তি ছিলো না। এক ঘন্টার স্পোর্টস। তারপর সন্ধ্যের সময়, মিলিটারি হিস্ট্রি, মিলিটারি ল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পড়াশুনা।
এতো দৈহিক পরিশ্রমের পর কি আর পড়াশুনা করা যায়? পড়তে বসলেই ক্লান্তিতে চোখ জড়িয়ে আসতো। প্রায় প্রতি রাতেই, পড়তে পড়তে ঘুমের বুকে ঢলে পড়েছি আমি।
নাহঃ কথা হয় নি। এই শেষ দুমাসে, তৃষ্ণার সাথে একবারও কথা হয় নি। মা বা কাকীমার সাথেও কোন কথা হয় নি। কেবল একদিন ছুটির দিনে, এদের তিনজনের প্রত্যেককে, একটা করে চিঠি লিখেছি আমি। অন্তরের ইচ্ছেকে নাড়াচাড়া করার কোন সময় ছিলো না আমার। জীবন খুব অদ্ভূত। তাই না? ভালাবাসা যেমন কর্মকে লুকিয়ে রাখতে পারে। কর্মও ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখতে পারে।
ব্যাপার হলো, মিলিটারি ব্যাপারটাই এরকম। মিলিটারিতে, সব ট্রেনিংই ইচ্ছে করে কঠিন করা হয়। মিলিটারি ট্রেনিংয়ের অলিখিত ফিলোসফি হলো- মানুষ এমনিতে অলস। মানুষকে তাই লাথি মেরে জাগাতে হবে।
মানুষকে না ভাঙলে, মানুষ গড়ে উঠে না। মানুষ যন্ত্রণা না পেলে, মানুষ তার মধ্যেকার শক্তিকে আবিষ্কার করতে পারে না। লাথি খাওয়া তাই কোন অপমান নয়। লাথি খাওয়া এক জাগরণ মন্ত্র। ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ যুক্ত জাগরণ মন্ত্র। যে যত লাথি খাবে, তার তত বেশি জাগরণ ঘটবে।
এজন্যই সব মিলিটারি ট্রেনিং, ভয়াবহ এক দৈহিক নির্যাতন। মানসিক নির্যাতন। নির্যাতন যত বেশী যন্ত্রণাময় হবে, মানুষ ততবেশী শক্ত সমর্থ হয়ে উঠবে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ট্রেনিং করতে করতে, এই যন্ত্রণা পাওয়াটাই আমার নেশা হয়ে উঠেছিলো। যন্ত্রণাকে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, যন্ত্রণাকে আমন্ত্রণ করতাম আমি। বলতাম-
এসো হে যন্ত্রণা
এসো তুমি নব বধূ সাজে।
ছিন্ন করো মন যদি
সাজাবো স্বপ্ন সাজে।
একদিন এক অফিসার আমায় বলেছিলেন-
'You know Amal, Man is a lazy bastard! He never wakes up unless someone kicks his arse hard.'
জানি, কথাটা খুব রূঢ়। কিন্তু কথাটা আলোর মতো সত্য। সূর্যের অস্তিত্বের মতো সত্য।
কিছু কথা আছে, যে গুলো রূঢ় করে না বললে, সহজে বোঝা যায় না। রূঢ় করে না বললে, তা মানুষের অন্তরের মধ্যে ঢুকে না।
মিলিটারি অফিসাররা, এ ধরণের রূঢ় কথা প্রায়ই বলেন। বলেন এই জন্য যে, তাদরেকে হিংস্র বাস্তবের সাথে ঘর করতে হয়। তাদের ছোট্ট ভুল, অসংখ্য সৈনিকের প্রাণ হরণ করতে পারে। অসংখ্য সাধারণ মানুষের প্রাণ হরণ করতে পারে। কাজেই, তাদেরকে কঠিন এবং রূঢ় হতেই হয়।
ডাক্তারদের মিলিটারি ট্রেনিং কঠিন। কিন্তু তা কি আর, স্পেশ্যাল ফোর্সের ট্রেনিংয়ের মতো কঠিন? নাহঃ তা কখনোই নয়।
কিন্তু ব্যাপারটা এবার একটু অন্যভাবে ভাবা যাক। ভারতীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী, যারা ডাক্তার, তারা কিন্তু খুব বেশি শরীর চর্চা করে না। শরীরচর্চা বা খেলধুলাতে তার বেশ অনভ্যস্ত। তাদেরকে যদি লক্ষ্নৌয়ের ৪০ বা ৪২ ডিগ্রী তাপমাত্রাতে, প্রতিদিন পাঁচ ঘন্টা দৈহিক নির্যাতন করা হয়, তো তারা তা কতটা সহ্য করতে পারবে? সেই প্রেক্ষিতে, এই ট্রেনিং কিন্তু বেশ কঠিন।
এবার যদি তৃষ্ণা কখনো আমাকে 'ক্যাবলারাম' বলে ডাকে, তো ওকে দেখিয়ে দেবো- কি ধাতু দিয়ে তৈরী আমি। ওর নাকের ডগায়, একশোটা 'পুশ-আপ', দুশোটা 'সিট-আপ', আর চব্বিশ মিনিটে, ব্যাকপ্যাক নিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দৌড়তে পারবো আমি।
আমি নিশ্চিৎ, তৃষ্ণা খুশি হবে। ভীষণই খুশি হবে। Woman loves courage in a man. Bravery in a man. Strength in a man.
কে জানে? খুশি হয়ে তৃষ্ণা হয়তো, আমার ঠোঁট দুটো কামড়ে কামড়ে খুবলে নেবে। তা নিক। একশোবার নিক। হাজারবার নিক। তৃষ্ণা যদি খুশিই না হবে, তো এতো পরিশ্রম করে, কঠিন এই ট্রেনিং করলাম কেন?
© Arun Maji
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem