Part 46
শেষ হয়েও, হইলো না শেষ। যুদ্ধ কি কখনো শেষ হয়? এক যুদ্ধ শেষ হলে, অন্য এক যুদ্ধ শুরু হয়। সভ্যতার আদি কাল থেকে, মানুষের মধ্যে এই অনন্ত যুদ্ধ চলছে।
কার্গিল যুদ্ধ জয়ের আনন্দে, পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে, ভয়ঙ্কর গোলাবৃষ্টি শুরু করলাম আমরা। আর মুহূর্তেই, পাকিস্তান তার উত্তর দিলো।
আমরা আজ ওদেরকে আক্রমণ করবো, ওরা তা জানতো। আর আমরা আক্রমণ করলে, ওরা তার উত্তর দেবে, তাও আমরা জানতাম।
পাহাড়ের এপারে আমরা। তো ওপারে ওরা। দেখাদেখি নেই। কিন্তু কথা হয়। মুখে মুখে নয়, কিন্তু গোলাবারুদের ভাষায়। গোলাবারুদ তো কি? কথা তো হয়।
মুখ দেখে আমরা পরস্পরকে চিনি না। কিন্তু আমরা দুপক্ষই, পরস্পরের আচরণ বড্ড বেশি করে চিনি। হবেই না বা কেন? পাকিস্তানও তো ভারতের অংশ ছিলো। ৫২ বছর আগে, পাকিস্তানীরাও নিজেদেরকে ভারতীয় বলে পরিচয় দিতো।
ভারতীয় আর্মির শিক্ষা সংস্কৃতি, ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া। পাকিস্তান আর্মির শিক্ষা সংস্কৃতিও, ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া। কাজেই, আমরা দুপক্ষই পরস্পরকে হাড়ে হাড়ে চিনি।
ফায়ারিং শুরু হতে না হতেই, খবর পেলাম, আমাদের 'ব্রাভো কোম্পানীর' এক হাবিলদার আহত হয়েছে। গুলি লেগেছে, গলাতে। খবরটা শুনেই বুক কেঁপে উঠলো আমার। অস্ফুট স্বরে স্বগতোক্তি করলাম- 'গলাতে'?
খবরটা শুনেই কিষেণকে বললাম, খুব দ্রুত এম্বুলেন্স রেডি করতে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই, COর ফোন এলো। CO বললেন-
Doc, wait. Enemy firing mortar.
But sir, injury is in the neck. It could be fatal.
I know. But it's extremely risky now.
আমি চুপ করে রইলাম। CO আর কিছু বললেন না। ফোনটা কেটে দিলেন।
কিন্তু বুকের মধ্যে কেমন যেন এক অস্বস্তি শুরু হলো আমার। গলাতে গুলি লেগেছে, অথচ এখন আমি যাবো না? ছেলেটাতো রক্তপাতে মারা যাবে এখুনি। হ্যাঁ, ছেলেটা পাক্কা মারা যাবে।
নাহঃ কিছু একটা করতেই হবে। COকে আবার ফোন করলাম আমি। ফোন উঠিয়েই COর জিজ্ঞাসা-
'What happened doc? '
Sir, if you allow me, I really want to go now. Otherwise, that boy might die.
'Too risky doc. Enemy firing heavily. You will put everyone in danger.'
We will wear armour. We will take small car.
CO কিছুক্ষণ ভাবলেন। পরে বললেন-
'Ok. If things go wrong, take shelter. Don't put yourself in danger.'
CO ফোনটা রেখে দিলেন। CO ফোন রাখতেই, কিষেনকে বললাম-
চলো কিষেণ। এম্বুলেন্সের জিনিসপত্র, মারুতি জিপসিতে লোড করো। শুধু জিপসি নিয়ে যাবো আমরা।
বেশী ছেলে নিলাম না সঙ্গে। কিষেন, আমি, রক্ষী বাহিনীর দুজন, আর ড্রাইভার- এই পাঁচজন রওনা দিলাম আমরা।
ভাগ্য ভালো, 'ট্যাক হেডকোর্টার' থেকে বেশ কিছুটা পথ পাহাড় ঢাকা। শত্রুপক্ষ আমাদেরকে দেখতে পাবে না। তাই বিপদের সম্ভাবনা কম। এছাড়া, মর্টারের ট্রাজেক্টরিও, এই জায়গাগুলোকে কখনো ছুঁতে পারে না। কিন্তু পাহাড়টা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে মস্ত বড় এক গ্যাপ। আর সেই গ্যাপের খাঁজ দিয়ে, ব্রাভো কোম্পানীর পোস্টে যাওয়ার রাস্তা।
গ্যাপে পৌঁছতেই বিপদের গন্ধ পেলাম আমরা। আমাদের মাথার উপর দিয়ে, চোঁ চোঁ করে কিছু বুলেট উড়ে গেলো। পরক্ষণেই দুম দাম ধুপ ধাপ আওয়াজ।
দেখলাম, বেশ কিছু মর্টার ধেয়ে এলো আমাদের দিকে। কিছু বুঝার আগেই, আমাদের মারুতি জিপসি, মুহূর্তেই এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলো। আমাদের চতুর্দিকে, এলোপাথাড়ি শেলিং শুরু হলো। বুঝলাম, একপ্রকার চক্রব্যূহে ফেঁসেছি আমরা।
সরু পাহাড়ি খাঁজে, গাড়ি ঘোরানোর কোন জায়গা নেই। কিন্তু হাবিলদার মকর সিং, বেশ অভিজ্ঞ ড্রাইভার। আমি কিছু বলার আগেই, ব্যাক গিয়ারে, ও গাড়ি পিছু নিয়ে গেলো।
পাহাড়ের আড়াল হতেই, মকর সিং গাড়ি থামালো। গাড়ি থেকে নেমেই, সকলের খোঁজ নিলাম আমি। আমাদের বড় সৌভাগ্য, আমাদের কেউই আহত হয় নি। কিন্তু আমাদের গাড়ির বনেট ক্ষতবিক্ষত।
শত্রুদের কাছে, গাড়ি বেশ বড় টার্গেট। এবং সহজ টার্গেট। বুঝলাম, গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না। গাড়িটাকে পাহাড়ের আড়ালে রেখে, মাটিতে হামাগুড়ি দিতে দিতে এগোতে থাকলাম আমরা।
পাহাড়ের খাঁজে, ছোট্ট এক নালা। ছোট বড় পাথর দিয়ে ঢাকা এই নালা। সেই নালা ধরে, বুক ঘষে ঘষে, দুশো মিটার এগিয়ে যাওয়ার পর, হটাৎ রেডিও সেট বেজে উঠলো আমাদের। হাবিলদার মকর সিং, রিসিভারটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। COর ম্যাসেজ। CO বললেন-
Doc, get back to cave. I have asked them to bring the casualty to cave.
COর ম্যাসেজ পেয়েই, গুহাতে ফিরে এলাম আমরা। পাহাড়ের আড়ালে এই গুহা। গুহাতে ঢুকেই, IV ফ্লুইড সেট, ড্রেসিং মেটিরিয়াল বের করে তৈরী থাকলাম আমরা।
প্রায় কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করার পর, ওরা এলো। ওরা মানে, আহত হাবিলদার রাম সিং, আর তার সঙ্গে চারজন রাইফেলম্যান।
নজর করলাম, রাম সিং চোখ বুজে যন্ত্রণা সহ্য করার চেষ্টা করছে। ওর কম্ব্যাট ড্রেস রক্তে ভিজে, চুপসে গেছে। কপালে ওর বিন্দু বিন্দু ঘাম।
গলার দিকে তাকালাম আমি। দেখি, গলাতে একটা 'উন্ড ড্রেসিং'। কিন্তু সেই সাদা ড্রেসিংও, রক্তে ভিজে টকটকে লাল।
কিষেনকে বললাম, রামের ব্লাড প্রেসার মাপতে। কিষেণ ব্লাড প্রেসার মাপলো। ৯০/৫২। আমি ওর পাল্স রেট চেক করলাম। ১১০।
বুঝলাম, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে ওর। খুব দ্রুত IV লাইন করে, ওকে দ্রুত ফ্লুইড দেওয়া শুরু করলাম।
এরপর, ওর ড্রেসিং খুলতেই, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এলো আমার দিকে। আমার গলা মুখ বুক ভিজিয়ে দিলো। অবস্থা বেগতিক দেখে, মুহূর্তেই, ড্রেসিংটা রাম সিংয়ের গলায় চেপে ধরলাম আমি।
বুকটা ধক করে উঠলো আমার। নিশ্চয়ই গলার কোন 'আর্টারি' কেটেছে। গলার আর্টারি কেটে রক্তপাত, ভয়ানক বিপজ্জনক পরিস্থিতি।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে, আমার এসিস্ট্যান্ট কিষেণ, খুব ভয় পেয়ে গেলো। দেখলাম, ওর কপালেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। ভয় পেলাম আমিও।
কিন্তু ভয় পেলে আমার চলবে না। এখানে আর কোন সাহায্য পাওয়া যাবে না। কিছু করতে হলে, আমাকেই করতে হবে। এবং তা এখুনি করতে হবে।
মনে মনে আমি ভাবলাম, কিছু যদি করি, তো রামের বাঁচার ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু কিছু না করলে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ও, মৃত্যুর বুকে ঢলে পড়বে।
নিজেকে বললাম আমি, কিছু আমাকে করতেই হবে। হ্যাঁ হবেই। কিষেণকে বললাম- Suture Set বের করতে। মুহূর্তেই, টম্যাস প্যাক থেকে, Suture Set বের করলো কিষেণ।
Sterile gloves পরতে পরতে, কিষেণের দিকে চেয়ে দেখলাম আমি। ও তখনও বেশ ভীত। ওকে সাহস জোগাতে হাসলাম আমি। বললাম-
রামকে অক্সিজেন দাও কিষেণ।
আর তুমিও Sterile gloves পরো।
মকর সিং আমার বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে। মকর সিংকে বললাম-
মকর, CO সাহেকে বলো, রাম সিংয়ের জন্য এখুনি হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে।
Suture, needle, scalpel তৈরী করে, রাম সিংয়ের ড্রেসিং খুললাম আমি। এবার খুব সাবধানে, একটু একটু করে। ড্রেসিং আলগা হতেই, আবার ফিনকি দিয়ে রক্তপাত। রক্তপাত হতেই, আর্টারিটা দেখতে পেলাম আমি। আর্টারিটা দেখতে পেতেই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম আমি। অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- 'পেয়েছি'
যে আর্টারিটা থেকে রক্তপাত হচ্ছিলো, মুহূর্তেই সেই আর্টারির গলাটা 'artery foceps' দিয়ে চেপে ধরলাম আমি। মুহূর্তেই রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেলো। 'artery foceps'-টা লক করে দিয়ে, Suture material দিয়ে, আর্টারিটাকে বেশ ভালো করে বাঁধলাম।
foceps-টাকে লক অবস্থায় রেখে, ওটাকে রাম সিংয়ের গলার চামড়ার সাথে সেলাই করে দিলাম আমি। যাতে, foceps-টা খুলে বেরিয়ে না আসে। Suture আর forseps, ব্যাস, ডবল প্রোটেকশান।
বুঝলাম, এর চেয়ে আর বেশি কিছু করা যাবে না এখানে। কিন্তু আসল বিপদটা, বোধহয় কেটে গেলো। হ্যাঁ, বোধহয়।
নতুন একটা ড্রেসিং দিয়ে, ক্ষতটা ঢেকে দিলাম আমি। এরপর মুখ তুলে তাকাতেই, মকর সিং, রেডিও সেটটা আমার মুখের সামনে ধরলো। সেটের অন্য প্রান্তে CO.
উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
'What's the situation doc? '
Ram got his neck artery severed. I clamped it and sutured it.
'Would he make it? '
He can, only if we could get him to hospital within an hour.
'Roger, Helicopter on way. Bring him to the brigade helipad. I Will meet you there.'
Roger.
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem