উত্তরণ খন্ড ৫৮ যুদ্ধের পটভূমিতে অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
'সাহাব, কিতনে আন্ডে কি ওমলেট লে আউঁ? '
কোন উত্তর না দিয়ে, জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে, বীরুর দিকে তাকালাম আমি। তাকিয়ে হাসলাম। বীরুও হাসলো।
ওর সেই ভুবন ভোলানো হাসি। পাহাড়ি ছেলের পাহাড়ি হৃদয়ের হাসি। সকালে ওর হাসি দেখে, দিনটা আমার বেশ সুন্দর হয়ে যায়। হেসে বললাম-
ছে আন্ডে কি।
'জি সাহাব।'
বীরু দ্রুত পায়ে চলে গেলো।
ওকে আমি বীরু নামে ডাকি। অবশ্য আর্মির সরকারী খাতায় ওর নাম- সিপাই বীরেন্দ্র সিং রানাওয়াত। বাড়ি চামোলি গাড়োয়াল। উঁচু পাহাড় আর সুন্দর ঢালু উপত্যকাযুক্ত, চামোলি গাড়োয়াল।
বীরু ফিরে এলো। একটা প্লেটে ওমলেট, আর একটা প্লেটে ব্রেড আর বাটার। সঙ্গে চা।
প্লেটগুলো আমার টেবিলে রেখে, ও চা ঢালতে শুরু করলো। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম-
তোমার বাবা মা কেমন আছেন বীরু?
'পাতা নেহি সাহাব। বহুত দিন ছুট্টি নেহি মিলা।'
যেতে চাও?
বীরু ঘাড় নাড়লো। সম্মতিসূচক। বীরুর দিকে চেয়ে রইলাম আমি। ও হাসলো। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে দেখলাম, ওর চোখে, জল চক চক করছে। জিজ্ঞেস করলাম-
স্রেফ মাকে দেখতে যাবে? না তোমার গার্লফ্রেন্ডও আছে?
বীরু হাসলো। কিন্তু কোন উত্তর দিলো না। তবুও মনে হলো, ওর নৈঃশব্দ যেন উত্তর দিলো। জিজ্ঞেস করলাম-
মেয়েটির ফটো নিয়ে ঘুড়ো নাকি?
কোন সময় নষ্ট না করে, বীরু প্যান্টের পকেট থেকে একটা পার্স বের করলো। তারপর পার্স থেকে, ছোট্ট পুরানো একটা ছবি বের করলো। ছবিটা এবার আমার সামনে মেলে ধরলো ও।
দেখি, ফুটফুটে এক পাহাড়ি মেয়ে। পরণে রঙীন পাহাড়ি পোশাক। মাথায় পাগড়ি। ছবিটা দেখে বললাম-
বাহঃ খুব সুন্দর তো।
'হাঁ সাহাব।'
হাসলাম আমি। বললাম-
ঠিক আছে। তোমার কোম্পানী কমান্ডারের সাথে কথা বলবো আমি।
আনন্দে লাফিয়ে উঠলো বীরু। বীরুর ধারণা, আমি কথা বললেই ও ছুটি পাবে।
আনন্দ হবে নাই বা কেন? জন্মমৃত্তিকা সব সময়ই প্রিয়। সবসময়ই পবিত্র। হোক সে অখ্যাত গ্রাম। হোক সে কুখ্যাত বস্তি। হোক সে দারিদ্র্য পীড়িত। মানুষের জন্ম যে মাটিতে, সে মাটি- তার এক মা। সেই জন্ম মাটিকে ছেড়ে, কদিন আর দূরে থাকা যায়? মাকে ছেড়ে কদিন আর দূরে থাকা যায়?
দূরে থাকা যায় না। তবুও দূরে থাকতে হয়। জীবন আর জীবিকার তাগিদে, মানুষকে এমন অনেক কিছু করতে হয়, যা মানুষ চায় না।
কারন- জীবন, মানুষের চাওয়াকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করে না। জীবন চলে জীবনের গতিতে।
সে গতি কেমন? নদীর প্রবাহের মতো। কখনো সোজা, কখনো বাঁকা। কখনো রুক্ষ্ম, কখনো কানায় কানায় পূর্ণ। কখনো কুলুকুলু ধ্বনি, কখনো গুরুগম্ভীর সিংহনাদ।
'সাহাব, আপ নেহি যাওগে? '
কোথায় বীরু?
'ছুট্টি।'
শুক্রবার যাচ্ছি।
'সাচ? '
হুঁ।
'বহত আচ্ছা সাহাব। আপকো জানা চাহিয়ে। আপকো ভি থোরি রেস্ট লেনা চাহিয়ে।'
বীরুর দিকে তাকালাম আমি। বীরু হাসলো। বললো-
'সব নে আপকো প্যার করতা হ্যায় সাহাব।'
সব নে?
'হাঁ সাহাব।'
কেন?
'পাতা নেহি সাহাব। '
বীরু হাসলো। আমি বললাম-
তুমি কলকাতা যাবে?
বীরু হাসলো, কিন্তু কিছু বললো না। আমি বললাম-
আমিও আমার মাকে খুব মিস করি বীরু।
'স্রেফ মাকো? আউর কিসিকো নেহি? '
বীরুর কথা শুনে হেসে ফেললাম আমি। বুক পকেট থেকে, একটা ফটো বের করে বীরুর সামনে মেলে ধরলাম আমি। সেটা দেখে, বীরু লাফিয়ে উঠলো। বললো-
'ম্যাডাম বহুত খুবসুরত হ্যায় সাহাব।'
হাঁ বীরু, খুব সুন্দর।
© ডাঃ অরুণ মাজী/সিডনি
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem