প্রেম ও যুদ্ধ অবলম্বনে অরুণ মাজীর গঠনমূলক উপন্যাস
----------------------------------------------
নীচে নেমে দেখি, মা মেঝের উপর আসন পেতে তৈরী। আমার পৌঁছতেই, আসনগুলো দেখিয়ে মা বললো-
'এখানে বোস তোরা।
তৃষ্ণা হাসলো। মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
'আমরা বসবো, আপনি বসবেন না? '
মা
'তোরা আগে খেয়ে নে। আমি পরে বসবো।'
তৃষ্ণা
'নাহঃ আপনিও বসুন আমাদের সাথে।'
মা কিছু বলার আগেই, তৃষ্ণা মায়ের জন্য একটা আসন তৈরী করলো। মা হাসলো। কিন্তু কিছু বললো না। হেসে, রান্না ঘরে চলে গেলো। মা রওনা দিতেই, মায়ের পিছু পিছু তৃষ্ণাও রান্না ঘরে গেলো।
মুহূর্তেই ফিরে এলো ওরা। হাতে ওদের রাতের খাওয়ার। খাওয়ারগুলো মেঝের উপর রেখে আসনে বসলো তৃষ্ণা। মা বসলো তৃষ্ণার পাশে।
খাওয়ারগুলোর দিকে এক পলক চেয়ে দেখলাম আমি। ভাত, মুগডাল, লেবু, আলুভাজা, পটলের দম আর মাছের কালিয়া। খাওয়ার গুলোর দিকে চেয়ে খুশীর হাসি হাসলাম আমি। তৃষ্ণা বললো-
'ঊহঃ মুগডাল আলু ভাজা দারুন লাগে আমার।
মা হাসলো। জিজ্ঞেস করলো-
'তাই? অমলেরও তাই। অমলের বাবাও, আলুভাজা আর মুগডাল খুব পছন্দ করতো।'
নীরবতা। বাবার কথা উঠলেই, মন যেন কেমন করে আমাদের। অথচ মা, বারবার বাবার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
খাওয়ারগুলো আমাদের থালায় ভরে, মা আমাদের দিকে চেয়ে রইলো। মায়ের থালা কিন্তু, তখনও শূন্য। তা দেখে, মায়ের থালাতেও খাওয়ারগুলো ভরে দিলো তৃষ্ণা। মায়ের দিকে চেয়ে ও বললো-
'আজ গল্প করতে করতে, একসাথে খাবো আমরা।'
মায়ের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। ভাতের সাথে ডাল আর লেবু মাখলো মা। তারপর তৃষ্ণার দিকে চেয়ে বললো-
'তুই আমার অভ্যাস খারাপ করে দিবি তৃষ্ণা।'
তৃষ্ণা
'কেন? '
মা
'দুদিন পর তুই বিদেশে চলে যাবি। তখন কে আমায় সঙ্গে করে খাওয়াবে? '
তৃষ্ণা
'আর তো মাত্র দুটো বছর। কাশ্মীর থেকে অমল ফিরলে, আমরা একসাথে থাকবো।'
মা হাসলো। চোখদুটো মায়ের ছলছল করে উঠলো। চোখের জল লুকোতে, মা মেঝের দিকে চেয়ে রইলো।
তৃষ্ণা বললো-
'আপনি একা একা অনেক কষ্ট করেছেন।'
মা
'তোদের সাথে যদি থাকবো, তো আমার শ্বাশুড়ীকে দেখবে কে? দেখলি তো, তোর ছোট কাকা বিয়ের পরদিনই শহরে চলে গেলো।'
তৃষ্ণা
'ঠাম্মারও ব্যবস্থা করবো আমরা।'
মা
'কি ব্যবস্থা করবি? এতো কি সামলাতে পারবি তোরা? '
তৃষ্ণা
'কেন পারবো না? তোমার ছেলে ডাক্তার।'
ওদের কথার মাঝে ঢুকে, আমি বললাম-
বৌমা তোমার বিদেশের জার্নালিস্ট।
আমাদের কথা শুনে, মা হেসে ফেললো। বেশ শব্দ করে। মাকে শব্দ করে হাসতে, অনেক বছর দেখি নি আমি। বুঝলাম, মা বেশ খুশী হয়েছে।
মনে মনে ভাবলাম, সন্তানের কাছে বয়স্ক মা বাবারা কিই বা আর চায়? না চায় তারা দামী পোশাক পরিচ্ছদ পরতে। না চায় তারা দামী খাওয়ার খেতে। তারা চায় শুধু, সন্তানের একটু সাহচর্য। কিন্তু কি সাংঘাতিক অক্ষম নপুংসক আমরা! মা বাবাকে সেটাও দিতে পারি না আমরা।
আমি ভাগ্যবান। তৃষ্ণা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে, মায়ের কথা ভেবেছে। আমি কিছু বলার আগেই, মায়ের জন্য ও একটা পরিকল্পনা করতে শুরু করছে।
খেতে খেতে, তৃষ্ণা হটাৎ ওর মাছের বাটিটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিলো। মায়ের চোখে চোখ রেখে বললো-
'মাছগুলো আপনি খেয়ে নিন। দিদির বাড়িতে এতো খেয়েছি আজ, কিছু আর খেতে ইচ্ছে করছে না।'
মা হাসলো। বললো-
'দূর পাগল, এতো মাছ আমি খাবো কি করে? '
তৃষ্ণা নাছোড়বান্দা। তৃষ্ণার বাটী থেকে, চামচ দিয়ে এক পিস মাছ তুলে নিলো মা। তারপর বাটিটা আবার তৃষ্ণার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
মা বললো-
'অমলের বাবা বেঁচে থাকলে, তোকে দেখে খুব খুশী হতো তৃষ্ণা।'
তৃষ্ণা চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর, প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে তৃষ্ণা বললো-
'ভাবছি, মা বাবার সঙ্গে আপনাকেও সিডনি ঘুরতে নিয়ে যাবো।'
মা একপ্রকার লাফিয়ে উঠলো। সন্দিগ্ধ সুরে বললো-
'সিডনি? '
তৃষ্ণা
'কেন নয়? পরে হবে কি হবে না, এখন আমি ওখানে আছি; জায়গাটা আপনারা ঘুরে নেবেন।'
মা আমার দিকে তাকিয়ে চোখের কোণে হাসলো। আমি বললাম-
তোমার বৌমা নিয়ে যেতে চাইছে তো যাও।
তারপর তৃষ্ণার দিকে চেয়ে বললাম-
কিন্তু মা যাবে কি করে? মায়ের তো পাসপোর্টই তৈরী নেই।
আত্মবিশ্বাসের সাথে তৃষ্ণা মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
'পাসপোর্ট নিয়ে ভাবতে হবে না। বাবা সে ব্যবস্থা করে ফেলবে।'
মা
'চৈতি যাবে বলেছে? '
তৃষ্ণা
'মাকে এখনো বলি নি। আপনি রাজি থাকলে, মা বাবাকেও জানিয়ে দেবো।'
মা
'আর আমার শ্বাশুড়ী? তাকে দেখবে কে? '
তৃষ্ণা
'ঠাম্মাকে একমাসের জন্য দিদির বাড়ি পাঠিয়ে দিলেই হবে।'
মা আমার দিকে চেয়ে হাসলো। তারপর বললো-
'দেখলি, তৃষ্ণা কত ভালো! তোর ভাগ্য ভালো, তৃষ্ণা তোকে বিয়ে করেছে। নইলে....'
আমি
নইলে?
মা
'নইলে তুই যা ক্যাবলা! '
মায়ের দিকে চেয়ে, কপট রাগের সুরে আমি বললাম-
তুমিও ক্যাবলা বলবে আমাকে?
মা
'ক্যাবলাকে ক্যাবলা বলবো না তো কি বলবো? '
আমি
কি বললে? আমি ক্যাবলা?
মা
'ক্যাবলা না হলে, এমন সুন্দর বৌকে ছেড়ে, তুই আর্মিতে চাকরী করিস? '
আমি
ঊহঃ তোমরা সবাই, আর্মি চাকরীর পিছনে পড়েছো।
মা
'কেন পড়বো না? আর্মিতে চাকরী করবি, জানিয়েছিলি আমাকে? '
বোধহয় তৃষ্ণা আমার রক্ষার্থে এগিয়ে এলো। ও প্রথমে আমার দিকে চেয়ে হাসলো। তারপর মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
'ভুল ও যা করেছে, করেছে। আর তো মাত্র কয়েকটা বছর।'
মা নজর করলো, টম্যাটোর চাটনিটা, তৃষ্ণা বেশ রসিয়ে রসিয়ে খাচ্ছে। তা দেখে, মা তার নিজের চাটনির বাটিটা, তৃষ্ণার থালায় ঢেলে দিলো। তৃষ্ণা হাসলো, কিন্তু কোন বাধা দিলো না। আমার দিকে চেয়ে ও কেবল হাসলো।
বুঝলাম, মায়ের ভালোবাসাতে ভাগ বসানোর, লোক এসেছে এখন। একটু আগে আমি যখন পড়ছিলাম, তৃষ্ণা মায়ের সাথে কয়েকঘন্টা গল্প করে গেলো। এতক্ষণ খেতে খেতে, মা কেবল তৃষ্ণার সাথেই গল্প করে গেলো। ভাবখানা এমন, যেন আমি এখন এক্কেবারে অনুপস্থিত।
মায়ের ভালাবাসা খুইয়ে, দুঃখ তো হলোই না; বরং বেশ আনন্দ হলো আমার। মাকে আমি যা দিতে পারি নি, তা যদি তৃষ্ণা দিতে পারে; তো ক্ষতি কি? নিজের অক্ষমতাকে ঈর্ষা দিয়ে ঢাকবো আমি?
সংসার আর বিয়ে নিয়ে অনেকর অনেক ক্ষোভ আছে। ভয় আছে। ভয় অবশ্য আমারও ছিলো। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সংসার বিয়ে- এ সবই মানুষের দরকার। সংসারই যদি থাকবে না, তো ভালোবাসার লোক আসবে কোথা থেকে? ভালবাসবে কে? ভালোবাসা কি আকাশ থেকে পড়বে?
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem