অমল বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলে আমি ওর গতিবিধি নজর করলাম। দেখলাম- গাড়িটা স্টার্ট করে ও প্রায় পঞ্চাশ মিটার এগিয়ে গেলো। তারপর গাড়িটা আবার রিভার্স গিয়ারে নিয়ে আমাদের বাড়ির একপাশে পার্ক করলো। তারপর গাড়ি থেকে বেরিয়ে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে আমাদের গেটের ভিতর ঢুকে এলো।
-
পরক্ষণেই আমাদের বাড়ির কলিং বেলে আওয়াজ তুললো। আমি কিছু না জানার ভান করে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলাম-
কে?
"আমি? "
আমি মানে?
"আমি অমল। "
দরজাটা খুলে অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে আমি বললাম তুমি!
"ফিরে এলাম। বাগান দেখবো বলে।"
মনটা আমার নেচে উঠলো। ইচ্ছে হলো অমলের বুকে এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়ি আমি। মুখে বললাম-মা বাবা এখন বাড়িতে নেই কিন্তু। মাসীর বাড়ি গেছে। রাতে ফিরবে।
"মানে? "
মানে হলো- তাদের যুবতী মেয়ের সাথে তুমি সময় কাটাবে, অথচ তারা কিন্তু বাড়িতে নেই।
তবে এয়ারপোর্টে ফিরে যাই আমি।
পারবে?
"এমনিতে পারি না। তবে তুমি তাড়িয়ে দিলে পারি।"
তাড়িয়ে দিলে তুমি চলে যাবে?
"একটু আধটু তাড়ালে যাবো না। কিন্তু ভয়ঙ্কর তাড়ালে নিশ্চয় যাবো।'
একটু আধটু তাড়ানোটা কেমন?
"ধরো, তোমার কিল চড় ঘুষি।"
আর ভয়ঙ্কর তাড়ানোটা কেমন?
"তা মুখে বলতে পারবো না। কিন্তু অনুভব করতে পারবো। সত্যিকারের তাড়ালে নিশ্চয় তা অনুভব করতে পারবো।"
কিল চড় ঘুষি সত্যিকারের তাড়ানো নয়?
"নাহঃ। তা এক ভয়ঙ্কর আমন্ত্রণ। "
আমি হেসে ফেললাম। হাসতে হাসতে আমি অমলের বুকে একটা চিমটি কাটলাম। অমল চিমটির জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো-"আর একবার প্লিজ।"
নাহঃ একবারই ভালো। ভালো জিনিসের কোন কিছু বেশি চাইতে নেই।
আমি অমলকে থামিয়ে দিয়ে বললাম তুমি সোফায় বসো। আমি মাকে খবরটা দিই।
-
মাকে ফোন করলাম আমি।
হ্যালো মা।
"হুঁ।"
অমল বাড়িতে এসেছে।
"কে অমল? "
ঊহঃ তুমি কিচ্ছু জানো না। সৃষ্টির দাদা অমল।
"তাকে তো তুই মিঃ মুখার্জী বলে ডাকতিস। তো সে অমল হলো কবে? "
তুমি না একটা যা তা। যাক গে, তোমরা তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো। এখন রাখলামআমি।
-
ফোনটা রেখে অনুভব করলাম, মা আমাকে একটু টিজ করলো। প্যাঁক লাগানোর সুযোগ পেলে হাতছাড়া কেউ করে না। মা তো নয়ই।
অমলের দিকে চেয়ে বললাম-মা আমাকে টিজ করলো।
"কি রকম? "
মা বললো- "তাকে তো তুই মিঃ মুখার্জী বলে ডাকতিস। তো সে অমল হলো কবে? "
"স্বাভাবিক প্রশ্ন। আমারও তো একই প্রশ্ন। অমল মুখার্জী কবে অমল হলো তোমার? '
তুমিও টিজ করছো আমায়।
টিজ করছি না। আমারও তা জেনে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।
বেশ ধন্য তুমি। এখন বলো, কি খাবে?
কিচ্ছু না। কেবল বাগান দেখবো।
শুধু বাগান দেখবে? আর কিচ্ছু না?
"ফুল দেখবো।"
আর?
"ফলও দেখবো।"
মানে?
"পরে বুঝবে।"
বেশ, তুমি আমার ঘরে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নাও । আমি তোমার জন্য চা বানিয়ে আনছি।
"একদিনে এতো প্রমোশন? "
প্রমোশন নয়। প্রিভিলেজ। কিন্তু বেশি দুষ্টুমি করলে সেই প্রিভিলেজ কেড়ে নেবো আমি।
"কি করে বুঝবো, কোনটা বেশি দুষ্টুমি আর কোনটা কম দুষ্টুমি? "
তা সময়ে আমি বুঝিয়ে দেবো। এখন যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।
-
অমল দোতলায় আমার ঘরের দিকে রওনা দিলো। আমি রান্না ঘরে ঢুকে গেলাম।
-
খুব ভালো লাগছে অমলের জন্য চা বানাচ্ছি আমি। ভাবলাম, অমলের জন্য চা বানাতে ভালো লাগছে কেন আমার? অমল কে? আবার সেই পুরানো প্রশ্নটা মাথায় এলো? অমল কে? অমল কি আমার প্রেমিক?
-
প্রেমিক শব্দটাতে আগে কতবার হেসেছি আমি।
আমাদের জীবনে এমন কয়েক হাজার কথা আছে, যা আমরা জানি। ব্যবহারও করি। কিন্তু সেই শব্দের তাৎপর্য আমরা ঠিক জানি না।
-
শব্দের পূর্ণ অর্থ তখনই বোধগম্য হয়, যখন সেই শব্দের অর্থ আমাদের জীবনে ঘটে। কারন তখন সেই শব্দকে নিজের জীবন আর হৃদয় দিয়ে অনুভব করি আমরা। অনুভব ছাড়া বোধ হয় না। হৃদয়ের সাহায্য ছাড়া সবই অবোধ্য। মস্তিস্ক অর্জিত জ্ঞান যদি আমের ছাল হয়, তো হৃদয় অর্জিত জ্ঞান আমের শাঁস।
-
প্রেম প্রেমিক প্রেমিকা শব্দগুলো জানতাম আমি। ব্যবহারও করতাম। কিন্তু সেই শব্দগুলোকে অনুভব করতে পারতাম না। আজ বোধহয় তা একটুএকটু পারছি। ভালোবাসার আঙিনায় ছোট্ট ছোট্ট কথা, ছোট্ট ছোট্ট ব্যথা, ছোট্ট ছোট্ট গাথা, ছোট্ট ছোট্ট কবিতা- সবই বিশালা মহীরুহ হয়ে উঠে। নইলে অন্যের জন্য একটুচা বানাতে এতো আনন্দ হবে কেন? হৃদয় এতো উচ্ছ্বাসী লাগামহীন হবে কেন?
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem