'ছোট্ট শিশু মনের আনন্দে হাসে। মনের আনন্দে খেলে। তার কোন উদ্বেগ নেই। কোন কারনে যদি ভয় হয় তার, তারস্বরে মা বা বাবাকে ডাকে সে। তার বিশ্বাস- মা বাবা এলেই, তার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
ঈশ্বর মানুষের বাবা-মা। মানুষ যদি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করে, ঈশ্বরকে ডাকলে, ঈশ্বর তার সমস্যার সমাধান করে দেবেন। তাহলে সে আর খুব বেশি উদ্বেগে ভুগবে না। মানুষ অনেক বেশি শান্তি পাবে তখন। ব্যাপারটা ঠিক, ছোট্ট শিশুর অকুন্ঠ চিত্তে তার বাবা-মাকে স্মরণ করার মতো।
জানিস চৈতি? অকুন্ঠ চিত্তে তুই ঈশ্বরকে ডাক। ঈশ্বরের উপর তুই সব ছেড়ে দে। দেখবি, আর উদ্বেগ হবে না তোর। অনেক বেশি শান্তি পাবি তুই।'
কতগুলো বলে- মা, কাকীমার দিকে তাকালো। কাকীমা মৃদু হাসলেন। মাও হাসলো।
আমি আর কাকীমা, মায়ের কাছে বসে। মা রান্না করছে। কাকীমা মাকে একটু সাহায্য করছে। পাশে আমি মাদুরের উপর বসে।
পিঁড়িতে উবু হয়ে বসে, মা এবার মাছ ভাজতে শুরু করলো। কাকীমা সব্জি কাটায় মন দিলেন।
সব্জি কাটতে কাটতে, কাকীমা, মা-কে বললেন-
'দিদি, তুমি বরং কলকাতাতে চলো। আমরা দুজন ওখানে থাকবো।'
মা হেসে বললো-
'আমি এখানে আমৃত্যু বাঁধা, চৈতি। আমার শ্বাশুড়ি অসুস্থ, দেওর আত্মভোলা। আর বাণী শ্বশুর বাড়িতে। আমি গেলে, ওদেরকে দেখবে কে? আমি বরং তোর কাছে, মাঝে মাঝে আসবো।'
আমি জানি, মায়ের কথার কোন নড়চড় হবে না। মা দাম্ভিক নয়, কিন্তু স্থিতধী। ঋষি সম স্থিতধী। মায়ের শিক্ষার অভাব থাকলেও, সাধারণ জ্ঞান বা বুদ্ধির অভাব কখনো দেখিনি। মায়ের ভেতরে হয়তো অনেক আলোড়ন আছে, কিন্তু বাইরে মা- শান্ত এক জলাশয়। কোন ব্যাঘাত ঘটলে, একটু তরঙ্গ হয়তো উঠে, কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই তা থিতিয়ে যায়।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমি যদি জীবনে কখনো মায়ের মতো প্রশান্ত হতে পারি, তো তাতেই ধন্য হয়ে যাবো আমি। মা, আমার রোল মডেল।
আমারও বিশ্বাস- কেউ যদি ঈশ্বরকে অকুন্ঠ চিত্তে বিশ্বাস করে, তো তার জীবনে প্রশান্তি অনিবার্য। তার জীবনে উদ্বেগ কমবেই কমবে।
মানসিক উদ্বেগ কি? মানসিক উদ্বেগ হলো এক ভয়। যা এখনো ঘটে নি, তাকে নিয়ে ভয়। যা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, তাকে নিয়ে ভয়। যা এখনো সমস্যা তৈরী করে নি, তাকে নিয়ে কৃত্রিম এক সমস্যা তৈরী করা। শান্ত জীবনকে অশান্তিতে জর্জরিত করার নামই হলো উদ্বেগ।
ঈশ্বর থাকা বা না থাকা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, জীবনে শান্তি পাওয়া। ঈশ্বর যদি এক কল্পনাও হয়, তো তাতে ক্ষতি কি? কল্পিত ঈশ্বরেও যদি শান্তি পাওয়া যায়, তো তাতে ক্ষতি কি? শান্তি মিললেই হলো। জীবনে শান্তিই বড় দুষ্প্রাপ্য। শিক্ষা খ্যাতি বা সম্পদ নয়।
এজন্যই, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে অন্যের সাথে ঝগড়া করা আমার স্বভাব নয়। আমার সমস্যা অন্যরকম। তা হলো- মা যতটা সহজে, ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে পারে, আমি পারি না। আমার শিক্ষা, আমাকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমার চিন্তাবোধ আমাকে সংঘাতে জর্জরিত করে। এতে হয়তো আমার মস্তিষ্কের তৃপ্তি হয়, কিন্তু হৃদয়ে প্রশান্তি আসে না।
এজন্য মা যত সহজে শান্ত হতে পারে, আমি পারি না। কাকীমা পারে না। জ্ঞান আর জীবন বোধে, কাকীমা খুবই পক্ক। তবুও কাকীমা সংঘাত আর যন্ত্রণায় ভুগেন।
কাকীমা ঈশ্বর ঘেঁষা, কিন্তু মায়ের মতো উনি এতোটা অকুন্ঠ চিত্ত নন। আর তার ফল? মা মুহূর্তের মধ্যে প্রশান্তি পেতে পারে, কিন্তু কাকীমার সময় লাগে। কাকীমাকেও, মনে মনে, অনেক যুদ্ধ করতে হয়।
আর আমি? আমার মধ্যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের দ্বন্দ্ব, আজও চলছে। মাঝে মাঝে, এই দ্বন্দ্বকে আমার আপদ মনে হয়, কারন এই দ্বন্দ্ব আমার মধ্যে অনেক যন্ত্রণা আনে। মানুষ হয়ে, প্রশান্তিই যদি পরম লক্ষ্য, তাহলে নিজেকে এতো সংঘাতে জর্জরিত করা কেন? আমি মূর্খ। শিক্ষার আড়ালে আমি মহামূর্খ।
কখনো কখনো আবার মনে হয়, আমার যদি মস্তিস্ক রয়েছে, তো তারও নিশ্চয় কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। মানুষ যদি শুধু অন্ধ বিশ্বাসে বিশ্বাসী থাকে, তো পৃথিবীতে পরিবর্তন আসবে কি করে? নতুন নতুন জ্ঞান, মানুষ আহরণ করবে কি করে? তাই আমার মনে হয়, কোন কোন সংঘাত যন্ত্রণাময় জেনেও, তা বুক পেতে গ্রহণ করতে হয়। নিজের জন্য নয়। এ পৃথিবীর জন্য। মানুষের জন্য।
হয়তো প্রশান্তি আর সংঘাত- এরা পরস্পর বিরোধী নয়। হয়তো এদের মধ্যেও কোন মেলবন্ধন আছে। এও হয়তো সৃষ্টির অন্যান্য দ্বৈত্ব সত্তার মতো। আঁধার না থাকলে যেমন আলো ফুটে না, তেমনি সংঘাত না থাকলে প্রশান্তি আসে না।
তাই, অস্তিত্বে বিশ্বাস করেও, অস্তিত্বকে প্রশ্ন করতে হয়। ঈশ্বরে বিশ্বাস করেও, ঈশ্বরকে প্রশ্ন করতে প্রশ্ন করতে হয়। দ্বৈত্য সত্তা সৃষ্টির পরিচয়। পরস্পর বিপরীত মুখী শক্তি, এই সৃষ্টিকে চিরন্তন করে। ভাঙা গড়া, জন্ম মৃত্যু, জোয়ার ভাঁটা, আলো আঁধার- এই বিপরীত মুখী শক্তির জন্যই সৃষ্টি শ্বাশত। সৃষ্টির সদস্যরা একক ভাবে নশ্বর। কিন্তু সমবেতভাবে অবিনশ্বর।
মহাবিশ্বে মানুষ যতদিন থাকবে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের সংঘাতও ততদিন জারি থাকবে। মানুষ যতদিন বাঁচবে, শান্তি আর অশান্তির সংঘাতও ততদিন জারি থাকবে।
ডালে খুন্তি নাড়তে নাড়তে, মা জিজ্ঞেস করলো-
'চৈতি, এদের বিয়েটা ঠিক করলি? '
কা-
'তুমি যদি বলো তো, তৃষ্ণা ছুটিতে এলে, তখনই হয়ে যাবে।
মা
'সেই ভালো। বিয়ে-থা তাড়াতাড়িই ভালো। তবে আমি কিন্তু বেশি খরচ টরচ করতে পারবো না। অমল নতুন চাকরী করছে, তো টাকা কোথায় আমাদের? '
কা
'সে সব তুমি ভেবো না। সে সব আমরা সামলে দেবো।'
মা
'চৈতি, যেখানে ঋণী না হলেও চলে, সেখানে ঋণী আমি হবো কেন? '
কা
'মানে? '
মা
'জীবনে অনেক সময় পড়ে আছে, লোক নিয়ে ফূর্তি করার। কাউকে ঋণী করে অপরাধী সাজানো ঠিক নয়। '
'দিদি, তৃষ্ণা যেমন তোমার মেয়ে, অমলও তেমনি আমার ছেলে। ওর জন্য আমি খরচ করবো, তাতে অমলের অপরাধ হবে কেন? '
মা চুপ করে রইলো। উনুন থেকে মা ডাল নামিয়ে রাখলো। কাকীমা মায়ের দিকে একটা পাত্র এগিয়ে দিলেন। বললেন-
'এই নিয়ে বরং আমরা পরে ভাববো।'
চাটনি বানাতে মা কড়াইয়ে তেলঢাললো। কাকীমা বললেন-
'শ্রীকে, এ সপ্তাহে আসতে বলেছি। তুমি বরং কলকাতা চলো আমার সাথে, ওখানে বসে সব ঠিক করে ফেলবো আমরা।'
মা
'আমাকে শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলতে হবে আগে।'
কা
'চলো, জেঠীমার সাথে, আমিও একটু কথা বলে আসি।'
চাটনি বানানো শেষ হলে, মা উনুনটা নিভিয়ে দিলো। এরপর, মা আর কাকীমা, ঠাম্মার কাছে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেলো। পিছন থেকে আমি বললাম-
মা, বিকেলে দিদির বাড়ি যাবো আমি। আগামী কাল ফিরবো।
কাকীমা পিছন ঘুড়ে বললেন-
'যাবি তুই? বাণীকেও সঙ্গে নিয়ে আসিস।'
মা
হ্যাঁ, বাণী আর দীপ দুজনকেই নিয়ে আসিস।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem