উত্তরণ খন্ড ১৫ খ (Trishna) Poem by Arun Maji

উত্তরণ খন্ড ১৫ খ (Trishna)

মাঠের রাস্তাটা যেখানে বাঁক নেয়, সেখানে একটা বট গাছ। বেশ পুরানো। এই বট গাছটা ছিলো, আমাদের অনেকের আশ্রয়। গরমের দিনে, মাঠে কাজ করতে করতে, যখন খুব কষ্ট হতো আমাদের; আমরা তখন এই বট গাছের নীচে আশ্রয় নিতাম।

সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম আমি। গাছটার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলাম। মনে হলো- গাছটা বেশ বুড়ো হয়ে গেছে। গাছটার কান্ডটা আরও বেশি কালচে আর ধূসর হয়ে গেছে। শাখা প্রশাখা পাতাও বেশ কম। কিছু কিছু মৃত শাখা গাছটাতে। যেন অকাল এক বার্ধক্যের ছাপ।

বেশ কষ্ট হলো আমার। মনে হলো, মানুষের জীবনের সঙ্গে, গাছের জীবনের কোন তফাত নেই। মানুষও বুড়ো হয়ে হতশ্রী হয়। গাছও বুড়ো হয়ে হতশ্রী হয়। মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ শুখনো আর দুর্বল হতে থাকে। গাছেরও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ শুখনো দুর্বল হতে থাকে। বৃদ্ধ মানুষকে অন্যেরা অবহেলা করে। বৃদ্ধ গাছকেও মানুষ অবহেলা করে।    

আজ বাড়িতে ফিরে, ঠাম্মার চেহারা দেখে বুকে যেমন কষ্ট হয়েছিলো আমার, এখন এই বট গাছটাকে দেখে ঠিক তেমনই কষ্ট হলো আমার।

মানুষই কি কেবল মানুষের আশ্রয় হয়? গাছ হয় না? ছেলেবেলায়, এই গাছটাই আমার আশ্রয় ছিলো। শুধু আমার নয়, আমার মতো মাঠে কাজ করতে থাকা বহু মানুষের।

আজও কিন্তু এই গাছটা বহু মানুষের আশ্রয়। কিন্তু একে দেখভাল করে কে? এর কথা মনে রাখে কে?

গাছ আর প্রকৃতি কেবল দিয়েই গেলো। আর মানুষ? সে কেবল নিয়েই গেলো। অথচ মানুষের কোন কৃতজ্ঞতা নেই। আমারও কোন কৃতজ্ঞতা নেই। আমি কি নেমকহারাম। তাই না?

সাইকেলে চড়ে বসলাম আবার। দিদি বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই, ঠোঁটের কোনে হাসি খেলে গেলো আমার। দিদি। আমার দিদি।

আমার সেই দিদি গো, যে দিদি মায়ের মতো মাতৃ স্নেহে মানুষ করেছে আমাকে। যে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে একদিন।

হ্যাঁ, প্রাণ বাঁচিয়েছে। দিদি আর আমি- আমরা দুজনেই তখন খুব ছোট। আমরা দুজন একটা ছোট্ট পুরানো কুঁড়ে ঘরের মধ্যে, পুতুল নিয়ে খেলছিলাম। প্রায় সন্ধ্যে হবে হবে তখন। হটাৎই চারিদিক কালো হয়ে এলো। সঙ্গে তুমুল ঝড়। কালবৈশাখীর করাল তান্ডব।

দেখলাম, দেওয়াল সমেত কুঁড়ে ঘরটা নড়ে উঠলো কয়েকবার। মুহূর্তেই খড়ের ছাউনি সমেত ঘরটা ভেঙে পড়তে শুরু করলো। দিদি এক পলকে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমাকে শুইয়ে দিলো। আমি নীচে। দিদি আমার উপর। ঘরের চালটা, পুরো দিদির উপর পড়লো। দিদি আহঃ করে আর্তনাদ করে উঠলো। দিদির আর্তনাদ শুনে, ভয়ে আমি কাঁদতে শুরু করলাম। সেই আর্তনাদের মধ্যেও, দিদি আমাকে বললো-
'কাঁদছিস কেন? আমি আছি না।'

দিদির কথা শুনে কান্না থামালাম আমি। কিন্তু ঝড়ের তান্ডব তখনও, সমান তালে চলছে। দিদি আমাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরলো। মনে হলো, শুধু ঝড় কেন, মৃত্যুও আমাকে দিদির কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। এমন অবস্থায় বেশ কিছুক্ষণ পড়ে রইলাম আমরা।

কিছুক্ষণ পর শুনলাম, মা আর কাকার গলার আওয়াজ-
'অমল... বাণী....'

চাপা অবস্থায় দিদি এক প্রকার গোঁঙানির সুরে আওয়াজ করলো-
'আমরা এখানে।'

মা আর কাকা, উৎকণ্ঠা নিয়ে দৌড়ে এলো। তারপর মা আর কাকা মিলে, আমাদের উপর থেকে, ভাঙা খড়ের চালটা সরিয়ে দিলো। দিদি এবার আমাকে কোলে নিয়ে উঠে বসলো।

দেখলাম, আমার বুকে রক্ত। আর সেই রক্তের উৎস দিদির মাথা। বুঝলাম, দিদির মাথাতে চোট লেগেছে। রক্ত ঝরছে দেখে, দিদির মাথায় হাত দিয়ে বললাম-
দিদি, রক্ত!

দিদি বললো-
ও কিচ্ছু না অমল।

হ্যাঁ, সেই দিদির বাড়ি যাচ্ছি আমি।  

© অরুণ মাজী

উত্তরণ খন্ড ১৫ খ (Trishna)
Sunday, January 17, 2021
Topic(s) of this poem: mother,romance,sister
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success