কথাটা বলেই, কথার প্রসঙ্গ ঘুড়িয়ে দিতে, মাকে আমি বললাম-
চলো মা। তোমাদেরকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি।
কাকীমা হাসলেন। উনি জিজ্ঞেস করলেন আমাকে-
'ঘুরে আসি মানে? '
আমি
ভাবছি, আপনাদেরকে শাড়ি কিনে দেবো।
কাকীমা, মায়ের দিকে চেয়ে হাসলেন। মাও হাসলো। আমাকে মা বললো-
'তোর প্রথম রোজগারের টাকা! আমরা এক্ষুনি যাবো।'
কাকীমা বললেন-
'ঊহঃ কি মজা! অমল আমাদেরকে শাড়ী দেবে! চলো, চলো। এক্ষুনি চলো।'
অর্থের পরিমান দিয়ে কোন কিছুর মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। কোন কিছু তখনই দামী হয়, যখন তা মানুষের মুখে চওড়া হাসি আনে।
গোধূলির অনির্বচনীয় রূপ বিনামূল্যে উপভোগ করা যায়। তো গোধূলি কি মূল্যহীন? পাহাড় ঘেড়া হ্রদের সৌন্দর্য বিনামূল্যে উপভোগ করা যায়। তো তা কি মূল্যহীন? নাহঃ। এরা সবাই অমূল্য।
জীবনের হিসেবে নিকেশ অনেক সহজ হয়ে যাবে, আমরা যদি হাসির দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা দিয়ে কোন কিছুর মূল্য নির্ধারণ করি। সঠিক মূল্যবোধ না থাকলে, সঠিক চিন্তা করবো কি করে? সঠিক চিন্তা না করলে, সঠিক জীবন গড়বো কি করে?
আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা দাম খুঁজি জামা কাপড়ের স্টিকারে। ফলে, জীবনে যা কিছু সত্যিকারের দামী, তা অবজ্ঞার আঁধারে হারিয়ে যায়। আর যা কিছু সস্তা আর বিশ্রী, তা আমাদের পূজ্য হয়ে উঠে।
অনেক কষ্ট করে, দশ-হাজার টাকা জমিয়েছি আমি। তাতে করে, মা কাকীমা ঠাম্মা দিদি আর ছোটকাকুর জন্য জামা কাপড় কেনা হলো বটে, কিন্তু শ্রী-কাকুর জন্য কোন কিছু কিনতে পারলাম না আমি। উল্টে, কাকুই আমাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিলেন। নিতে চাই নি আমি। তবুও জোর করে উনি দিলেন আমাকে।
অথচ আমার দেওয়া শাড়ীগুলো বেশ সাধারণ মানের। তবুও কিন্তু মা আর কাকীমার মুখে, চওড়া এক হাসি। মা আর কাকীমা, গাড়ির পিছনে বসে বারবার বলতে লাগলো-
'ঊহঃ কি মজা, অমল শাড়ী দিয়েছে আমাদেরকে! '
মা আর কাকীমার এই উচ্ছ্বাস দেখে কাকু গাড়ি চালাতে চালাতে হাসলেন। উনি মৃদু স্বরে আমাকে বললেন-
'জানিস, এরপর তুই একদিন এদেরকে দশগুন দামে শাড়ী কিনে দিবি। সেদিন হয়তো এদের এতো বেশি আনন্দ হবে না।'
আমি-
কেন?
কাকু-
'আজকের দেওয়ায় তোর ভালোবাসা বেশী, সামর্থ্য কম। পরে, তুই যেদিন ধনী হবি, সেদিন হয়তো এর উল্টোটা হবে। এ ছাড়া, এ তোর প্রথম দেওয়া। পরে, পাওয়ার অভ্যাস, পাওয়ার আনন্দকে হত্যা করবে।'
কাকু এবার, মা আর কাকীমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-
'সব কিছুই ভালোবাসার দামে দামী হয়। হাসির দামে দামী হয়। তাই না? তোমরা কি বলো? '
মা আর কাকীমা সমস্বরে বললো-
'একদম ঠিক কথা।'
কাকুর কথাটা ভাবার চেষ্টা করলাম আমি। ভাবলাম, ভালোবাসার নিজস্ব একটা রূপ আছে। মোহিনী শক্তি আছে। সাধারণ জিনিসকেও, ভালোবাসা অমূল্য করে তুলে।
এর আগেও দেখেছি, তৃষ্ণার অনেক দামী দামী জামাকাপড় আছে। তবুও কিন্তু তৃষ্ণা, আমার দেওয়া কম দামী লাল শাড়ীটাই বেশী পরে। জামাকাপড় দিয়ে নিজেকে ঢাকা এক কথা। আর ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে নিজেকে ঢাকা অন্য কথা।
শাড়ি দিয়ে ঢেকো না আমায়
ঢেকো ভালোবাসায়।
অলঙ্কারে ভুলিও না আমায়
ভুলিও ভালোবাসায়।
আসলে, মা কাকীমা বেশ ভালো করেই জানে- আমার দেওয়া শাড়ি, আসলে শাড়ি নয়। এ হলো আমার হৃদয়ের ভালোবাসা। আমার অন্তরের পূজা।
ওহে মানুষ,
কখনো যদি কাউকে কোন কিছু দিতে চাও
তো হৃদয়ের স্পন্দন দাও
আত্মার হাসি দাও
হৃৎপিন্ডের রক্ত দাও
তোমার সাগর চোখের অশ্রু দাও।
সেই দেওয়াই
তোমার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ দেওয়া।
অথচ কি দুর্ভাগ্য আমাদের! আমরা হৃদয়ের স্পন্দনের মূল্য দিই না। আমরা মূল্য দিই সোনার অলঙ্কারের দূত্যিকে। এইভাবেই আমরা, আমাদের প্রিয়জনকে বারবার অপমান করি। তাদেরকে হৃদয়ের চেষ্টাকে অবজ্ঞা করি। অবহেলা করি। এভাবেই আমরা প্রিয়জনকে দূরে ঠেলে দিই।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem