ট্রেনটা এবার চন্ডীপুর স্টেশনে থামলো। ট্রেনটা থামতেই ব্যস্ত হয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম আমি। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলাম, এখন রাত প্রায় দশটা।
দ্রুত পায়ে, বাস স্টপেজে এলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার! এতো রাতে, বাড়ি ফেরার জন্য কোন বাস পেলাম না।
বাস না পেয়ে, সামনের এক চায়ের দোকানে, চা-ওয়ালার সাথে কথা বলতে শুরু করলাম আমি। কিন্তু সেই চা-ওয়ালা, কোন পথ বলতে পারলো না।
চায়ের দোকান ছেড়ে, এদিক ওদিক চেয়ে দেখছি আমি। এমন সময় দেখলাম, একজন লোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন। উনি আমার দিকে চেয়ে আমাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
'কোথায় যাবে ভাই? '
আমি বললাম-
চন্ডীপুর স্কুল পাড়ায়।
'এখন আর কোন বাস নেই। কিন্তু এখন একটা লরি যাচ্ছে ওদিকে।'
কিছু না বলে, ওনার দিকে চেয়ে রইলাম আমি। উনি বললেন-
'এসো আমার সাথে।'
লোকটা আমাকে, লরির কাছে নিয়ে গেলেন। তারপর সেই লরির ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বললেন-
'হারু, একে স্কুলপাড়ায় নামিয়ে দিস তো।'
কথাগুলো বলেই, লোকটি দ্রুত প্রস্থান করলেন। লোকটি চলে গেলে, ড্রাইভারের পাশে উঠে বসলাম আমি। কিন্তু সিটে বসতেই, মদের এক দুর্গন্ধ ভেসে এলো নাকে। বুঝলাম, ড্রাইভারের মুখ থেকেই আসছে এই দুর্গন্ধ! বেশ ভয় হলো আমার। ভাবলাম, ড্রাইভার মাতাল হলে প্রাণের ঝুঁকি বেশ।
কিন্তু উপায় কি আমার? এতো রাতে, ফাঁকা রাস্তায় দশ কিলোমিটার হেঁটে যাওয়া, সেও কিন্তু কম বিপজ্জনক নয়। ড্রাইভার আমার দিকে ক্ষণিকের জন্য চেয়ে দেখলেন। তারপর নজর ঘুড়িয়ে নিলেন। আমি নজর করলাম, ওনার চোখ বেশ লাল।
উনি কোন কথা বললেন না। স্টিয়ারিংয়ের সামনে রাখা, দেবতার ছবি ছুঁয়ে প্রণাম করলেন আমি। তারপর 'জয় মা তারা' বলে গাড়ি স্টার্ট দিলেন।
গাড়িটা চলতে শুরু করলে, বুঝলাম, মাতাল হলেও উনি বেশ সাবধানী। গাড়ির গতি, উনি বেশ কমই রাখলেন।
লরি থেকে যখন নামলাম, দেখলাম, আমাদের স্কুলপাড়া বেশ শুনশান। কেউ জেগে নেই। গাড়ি থেকে নামতেই, কতকগুলো কুকুর উচ্চৈঃস্বরে ঘেউ ঘেউ করে চীৎকার করে উঠলো। বুঝলাম, এতো রাতে অতিথি দেখতে, ওরা খুব বেশি অভ্যস্ত নয়।
স্কুলপাড়া থেকে, আমাদের বাড়ি প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। এতো রাত হলেও, গরম কিন্তু কমে নি। কোন ঠান্ডা হাওয়া নেই। গাছগুলোর পাতা পর্যন্ত নড়ছে না। সব মিলিয়ে, ভীষণই ভ্যাপসা এক গরম।
এতো বেশী গরম ঠান্ডা ভাবার অবকাশ নেই আমার। তাই পথ হাঁটতে শুরু করলাম। দ্রুত। বেশ দ্রুত। কিন্তু একটুখানি হাঁটার পরই, ঘেমে নেয়ে গেলাম আমি। কি ভেবে, জামাটাকে খুলে, কাঁধে নিয়ে নিলাম।
কষ্ট আছে। পরিশ্রম আছে। কিন্তু কোন ক্লান্তি নেই আমার। এখন শুধু তৃপ্তি আর তৃপ্তি। লক্ষ্নৌ যাওয়ার আগে, মাকে দেখে যাওয়ার তৃপ্তি। ভাবলাম, আর কয়েক কদম হাঁটা, আর তারপরই, মাকে দেখার প্রশান্তি।
হাঁটতে হাঁটতে, রাস্তার বাঁকে সেই বটগাছটার নীচে পৌঁছে গেলাম আমি। হ্যাঁ, সেই গাছ- আমার সেই পুরানো বন্ধু।
সত্যি বলতে কি, আমার কাছে এ কোন গাছ নয়, এ আমার আশ্রয়। এ আমার ছেলেবেলার সাথী।
আমার সুখের সাথী। দুঃখের সাথী। আমার বড় হওয়ার সাথী।
আজও কিন্তু ওকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। এতো রাতে, আগে কখনো দেখিনি ওকে। রাতে, ও আরও বেশী স্নিগ্ধ। আরও বেশী প্রশান্ত। ভাবলাম, ও ঠিক আমার মায়ের মতো।
ওকে জড়িয়ে ধরতে, মাকে জড়িয়ে ধরার অনুভূতি হলো আমার। নাহঃ আর কোন তাড়া নেই আমার। বাড়ি প্রায়, পৌঁছেই গেছি আমি।
মাথার উপর রাতের আকাশ। পায়ের নীচে সবুজ ঘাস। আর সামনে, ছোট্ট খালের আঁধারে ঢাকা জলরাশি। বড় প্রশান্তিময় এই পরিবেশ।
কতকগুলো পাখির, ডানার আওয়াজ ভেসে এলো। গাছটার পাতাগুলো একটু নড়ে উঠলো। ঠান্ডা একটু হাওয়া, ক্ষণিকের জন্য ভেসে এলো।
ভাবলাম, কি আশ্চর্য! এতক্ষণ হাঁটলাম আমি, অথচ কোথাও একটু হাওয়া পেলাম না। কিন্তু যেই না এই গাছটার নীচে দাঁড়ালাম আমি, তখুনি ঠান্ডা হাওয়া ভেসে এলো বুকে।
জামাটাকে গোল্লা করে পাকিয়ে, সেটাকে বালিশ বানিয়ে, ঘাসের উপর শুয়ে পড়লাম আমি। আহঃ কি আরাম! এখনও কোন ক্লান্তি নেই। কোন তাড়া নেই আমার।
ঘাসের উপর শুয়ে, বটগাছটার দিকে চেয়ে মনে মনে বললাম-
বিদায় বন্ধু। জানি না, কবে হবে দেখা আবার! কিন্তু দেখা আমাদের হবেই। তোমার সাথে আত্মার সম্পর্ক আমার হে ভাই, তোমার সাথে আত্মার সম্পর্ক আমার।
'আত্মার সম্পর্ক' কথাটা ভাবতেই, চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লো আমার। ভাবলাম, একটা গাছও কি বন্ধু হতে পারে মানুষের? কেন পারে না? আলবৎ পারে। হাজার বার পারে। এই গাছই তো তার প্রমাণ।
আনন্দের দিনে ওর সাথে হেসেছি আমি। দুঃখের দিনে ওর সাথে কেঁদেছি আমি। সঙ্কটের দিনে, ওর সাথে উথাল পাতাল ভেবেছি আমি। এই নিবিড় সম্পর্ক, বন্ধুত্ব তো নয় তো কি?
শোয়া অবস্থা থেকে, ধড়ফড় করে উঠে পড়লাম আমি। এখন মন আমার প্রফুল্ল। যাক, এই গাছের কাছ থেকেও অনুমতি নিয়েছি আমি। এবার মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নেবো, তারপর বেশ শান্তিতে, লক্ষ্নৌ যেতে পারবো আমি।
ব্যাগের সাথে, জুতোটাও হাতে নিয়ে, এই নির্জন রাতে দৌড়তে শুরু করলাম আমি। ভাবলাম, একটু কি পাগলামি করছি আমি? কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, মায়ের কাছে ফিরছি, তো আনন্দে পাগল হবো না?
বাড়ির সিঁড়ির কাছে পৌঁছতেই, আমাদের বাড়ির কুকুর- ভোলা, ভয়ঙ্কর চীৎকার করতে করতে বেরিয়ে এলো। তারপর যেই না আমাকে দেখলো, শান্ত হয়ে আমার কাছে ছুটে এলো ও।
ওর গলায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, আমাদের বাড়ির সিঁড়ি চড়তে শুরু করলাম আমি। আগে আগে ভোলা। পিছন পিছন আমি। গেটের সম্মুখে ভোলা শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বাড়ির গেটে, খট খট করে আওয়াজ করলাম আমি। ঘুম জড়ানো গলায়, ভেতর থেকে মা জিজ্ঞেস করলো-
'কে, অমল? '
আমি বললাম-
হ্যাঁ
একপ্রকার ছুটে এসে, গেটের দরজা খুললো মা। ঘরে ঢুকে, মায়ের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম-
মা, কেমন করে তুমি বুঝলে, আমি এসেছি?
আমার দিকে চেয়ে, খুশীর হাসি হেসে মা বললো-
'এখুনি যে তোকে স্বপ্নে দেখলাম, বাবা।'
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem