উত্তরণের পথে ৮খ অরুণ মাজীর অবিশ্বাস্য রোমান্টিক উপন্যাস
তৃষ্ণা বলে, আমি নাকি ক্যাবলা। তাই আমি এত অগোছালো। মাঝে মাঝে রাগ হয় আমার। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, ও কি আর সবার সামনে ক্যাবলা নামে ডাকে আমাকে? নাহঃ। ও কেবল আড়ালেই ডাকে আমাকে। আড়ালে ডাকলে অপমান হয় না। বরং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাতে। সত্যি বলতে কি, তৃষ্ণার মুখে ক্যাবলা নাম, ভালোই লাগে আমার।
আসলে মানুষের ভেতর ভালোবাসা থাকলে, তার সব ভালো লাগে। তার করা টিটকিরিও ভালো লাগে। তার দেওয়া অবজ্ঞাও ভালো লাগে। তার দেওয়া যন্ত্রণাও ভালো লাগে।
আসলে তৃষ্ণা বেশ প্রিয়। ভীষণই প্রিয়। তবুও ওকে কখনো প্রেমিকা ভাবতে পারি না আমি। নাহঃ কখনো না। যদিও তৃষ্ণা কিন্তু তাই-ই চায়।
কেন এমন হয়? অনেক ভালোবাসা অযাচিত আসে, কিন্তু মানুষ তাতে সাড়া দিতে পারে না। মনে মনে একটু চাইলেও, বাস্তবে সে পারে না। কে জানে? হয়তো মানুষ অপেক্ষা করে, কোন বিশেষ এক মুহূর্তের জন্য। কোন বিশেষ এক সন্ধিক্ষণের জন্য।
তৃষ্ণা বলে- ওর নাকি পোড়া কপাল! তাই আমি ওর ডাকে সাড়া দিই না। ওর তাতে কষ্ট হয়, কিন্তু ও কখনো ভেঙে পড়ে নি। ও বলে- মানুষের প্রেমের কুন্ডলী নাকি, মানুষের জন্মের আগেই, নক্ষত্রের বুকে তৈরী।
কে জানে? হয়তো আমার কুন্ডলী, আর ওর কুন্ডলী; সেই সমীকরণের মধ্যে নেই। হয়তো এই ভাবনা দিয়ে, ও নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। আমিও আমাকে সান্ত্বনা দিই।
মাঝে মাঝে ভাবি, এটা কি সম্ভব? মানুষের ভাগ্য, মানুষের জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়? মাঝে মাঝে ঠাম্মার কথাগুলো মনে পড়ে আমার। ঠাম্মা বলতো-
'জানিস অমল? নক্ষত্রের দেশ থেকে এসেছি আমরা। টিম টিম করে জ্বলতে থাকা, কোন এক দূরের নক্ষত্র থেকে। সকলের অজান্তে, নক্ষত্রের আলো হয়ে ঝরে পড়েছি পৃথিবীর বুকে।
তারপর, এই পৃথিবীর বুক থেকে আমার মায়ের সৃষ্টি। তারও পর, আমার মায়ের গর্ভ থেকে আমার সৃষ্টি।
মৃত্যুর দিনে মিশে যাবো আমি, পৃথিবীর মাটিতে। তারপর সেই মাটি থেকে নির্গত ধূলিকণা, বাতাসে ভর করে, পৌঁছে যাবে নক্ষত্রের বুকে। সেখানে আমাদের পিতা। পরম পিতা।
ঠাম্মা থেমে, আমার গালে একটা হামি দিতো। তারপর বলতো-
জানিস? পৃথিবীটা একটা বাগান। মানুষ এই বাগানে বেড়াতে আসে। বেড়াতে এসে, সে ফুল তুলে। ফল খায়। ফুলের গন্ধ নেয়। নদীতে সাঁতার কাটে। কিন্তু ভ্রমণ শেষে, আবার সে ফিরে যায় নক্ষত্রের বুকে।'
তৃষ্ণা বা ঠাম্মার কথাগুলো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পারি না। বাসুবাবুর অঙ্কগুলো, মাথায় এসে কিলবিল করে। বাসুবাবু বলেন-
'অমল, অঙ্ক দিয়ে যা প্রমাণ করা যায় না, তাকে অনুসন্ধান করবি। কিন্তু সত্য বলে কখনো গ্রহণ করবি না।'
তৃষ্ণাকে ভালবাসতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু কোথা থেকে একটা বাধা চলে আসে। আমি এড়িয়ে যাই। পালিয়ে যাই।
অথচ তৃষ্ণার মধ্যে আগ্রহ আছে, কিন্তু ক্ষোভ নেই। প্রেম আছে, কিন্তু আসক্তি নেই। দয়া আছে, কিন্তু দুর্বলতা নেই। আমি ওকে ফিরিয়ে দিই। তবুও তৃষ্ণা, আমার সাথে অনেক সহজ ভাবে মেশে। আমি ভুল কথা বলি। কঠিন কথা বলি। তবুও কিন্তু কোনদিন রাগ করে না ও।
পৃথিবী কি বিচিত্র তাই না? পৃথিবীতে এমন সুন্দর হৃদয়ের মানুষ আছে, যা অনুভব না করলে বোঝা যায় না। অবাক হই আমি, মাটির মানুষ হয়েও, কোথায় পায় এরা এই অদম্য শক্তি? এই নিরাসক্ত ভালোবাসা? এই অসম্ভব ধৈর্য্য? এই নিঃশর্ত ক্ষমা?
আবার বলছি, তৃষ্ণাকে আমি ভালোবাসতে চাই, কিন্তু পারি না। কেন পারি না? জানি না। সত্যিই জানি না।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem