সাইকেল থেকে নামলাম আমি। নেমে, গাছটার নীচে এলাম। তারপর গাছটার গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসলাম।
দেখছি, খালের ওপারে রাস্তার উপর, সারি সারি ইউক্যালিপ্টাস গাছ। তাদের মাথার উপর দিয়ে সূর্য ঢলে পড়েছে।
শীতের দিন। সূর্যের তেমন তেজ নেই। হটাৎই ঢলে পড়া সূর্যের আলোয় জ্বলে উঠলো সেই ঘাট। ডোমপাড়ার ঘাট। ওপারের রাস্তা থেকে নেমে এসেছে, সেই ঘাট।
সেই ঘাটে, একটা কাঠের গুঁড়ির উপর, মধ্য বয়সী একটি মেয়ে কাপড় কাচছে। অদূরে, ছোট্ট একটি ছেলে। ন্যাংটো। মায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পাশে, আরও কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে, বঁড়শি নিয়ে মাছ ধরছে।
ওপারের রাস্তার উপর, প্রায় এক ডজন ছোট্ট বাড়ি। খড়ের ছাউনি দেওয়া, মাটির বাড়ি। সেই বাড়ি গুলোর ভেতর থেকে ভেসে আসছে, ঢাক আর কাঁসরের শব্দ।
ডোম পাড়া। ভীষণ পুরানো এক ডোম পাড়া। পাড়াটা আগে খুব বড় ছিলো। এখন আর খুব বেশী বড় নয়।
ঐ পাড়ার লোকেদের কাজ- বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, ঢাক আর কাঁসর বাজানো। ওদের রুজি রোজগার কেবল, কোন আচার অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে। বাকি সময় ওরা, প্রায় কর্ম্মহীন।
ওদের আজকের প্রজন্ম, আর ঢাক বাজাতে চায় না। তারা এখন, অন্য কাজ করে। কেউ রিক্সা টানে। কেউ মজুর খাটে। কেউ সব্জি বেচে। কেউ ভাগ চাষ করে।
যারা বয়স্ক, তারাই কেবল পাড়ার ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। কে জানে, আগামী দিনে, আর কেউ কখনো ঢাক বাজাবে কিনা!
কখনো কখনো একটু রাতে, এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরি আমি। শুনি, মদ্যপ অবস্থায় ওদের উন্মত্ত চীৎকার চেঁচামেচি আর গালাগালি। অথচ রাগ হয় না আমার। কষ্ট হয়।
জীবনটা ওদের সহজ নয়। বাড়িগুলো সব ভাঙাচোরা। ঝড় বৃষ্টিতে বেশ কষ্ট ওদের। কে জানে? দশ বছর পরে, ঐ পাড়াটা আদৌ বেঁচে থাকবে কিনা!
ছোটবেলার কথা মনে পড়লো। তখন আমার বয়স হয়তো ছয় বা সাত। কাকুর সাথে প্রায়ই আসতাম এখানে।
মাছ ধরতে আসতাম আমরা। প্রায় প্রত্যেক বিকেল বেলায়। তখন থেকেই এই জায়গাটাকে ভালোবাসি আমি। ভালোবাসি, এই বটগাছটাকে। ভালোবাসি, ঐ পাড়াটাকে।
ওরা আমাকে প্রায়ই দেখে। আমিও ওদেরকে প্রায়ই দেখি। দূর থেকে দেখে দেখেই, এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আমাদের। নিঃশব্দ সম্পর্ক।
কাকুর কাছ থেকে শুনেছি, ডোম পাড়ার মানুষগুলো বেশ ভালো মানুষ। ওদের বাড়ির মেয়েরা, খুব সুন্দর ঝুড়ি বুনে। সেগুলো বেশ উঁচুমানের শিল্প। কিন্তু সে সব সুন্দর জিনিস কদর করবে, এমন লোক নেই এখানে। শহরে গিয়ে ওরা সেগুলো বেচবে, সে ব্যবস্থাও নেই।
কাকু বলতো-
'জানিস অমল? একদিন ঐ ডোমপাড়া হারিয়ে যাবে। গ্রামগুলো সব হারিয়ে যাবে। ভালোমানুষ গুলো সব হারিয়ে যাবে। ক্ষুধার্ত মানুষ, বড় তাড়াতাড়ি পশু হয়ে যায়। গ্রামের মানুষগুলো হন্যে হয়ে ঘুরছে এক টুকরো রুটির জন্য। এদের শিক্ষা নেই। চেতনা নেই। সুযোগ নেই। কিছুই নেই এদের। শুধুমাত্র ভাগ্যের উপর ভরসা করে বেঁচে আছে ওরা।
কাকু আক্ষেপ করে বলতো-
'জানিস? পৃথিবীটা ক্রমশ নিষ্ঠুর হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। যাদের বেশী আছে, তারাও আরও পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। দুর্বলদেরকে তারা আরও বেশী শোষণ করে যাচ্ছে।'
কথাগুলো বলতে বলতে, কাকু বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠতো। বলতো-
'সাধারণ মানুষকে যদি দাবিয়ে রাখতে চাও, তো তাদেরকে মূর্খ রাখো। তাদেরকে যদি শাসন করতে চাও, তো তাদেরকে ক্ষুধার্ত রাখো।
কি ভাবে? ওদেরকে যুগযুগ ধরে আফিম খাওয়াও। ঘৃণার আফিম। হিংসার আফিম। ধর্মের আফিম। জাতপাতের আফিম। প্রতিশ্রুতির আফিম। সেই আফিমের ঘোরে, নিজেদের মধ্যে লড়াই করবে ওরা। পরস্পরকে খুন করবে ওরা।
আর কিছু ক্ষমতাশালী বুদ্ধিমান লোক? এই দাঙ্গার সুযোগ নিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করবে। দেশের তহবিল তছরুপ করবে।
ঘরে আগুন লাগলে, কেউ কি কখনো উত্তরণের ভাবনা ভাবতে পারে? অনাহার দুর্ভিক্ষ দাঙ্গা থেকে বাঁচতেই যদি ব্যস্ত, তো গরীব মানুষরা তাদের অধিকার চাইবে কখন? শিক্ষা চাইবে কখন? স্বাস্থ্য চাইবে কখন? ভালো মানের জীবন চাইবে কখন? '
কথাগুলো বলতে বলতে, কাকুর গলা ভারী হয়ে আসতো। কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকতো কাকু। বেশ কিছুক্ষণ পর কাকু বলতো-
তুই বড় হ অমল। মানুষকে, চেতনার বিকাশে সাহায্য করিস তুই। চেতনা আনে সংগ্রাম। সংগ্রাম আনে বিপ্লব। বিল্পব আনে মুক্তি।
মানুষের মুক্তি, অর্থ খ্যাতি বা প্রতিপত্তিতে নয়। মানুষের মুক্তি তার চেতনার বিকাশে।'
কথাগুলো বলে, বঁড়শির সুতো গুটিয়ে রাখতো কাকু। তারপর আমার দিকে চেয়ে বলতো-
চল, বাড়ি যাই। আজ আর ভালো লাগছে না মাছ ধরতে।
বঁড়শিগুলো আমার হাতে দিয়ে, কাকু উবু হয়ে বসতো। আর তখুনি, কাকুর কাঁধে লাফিয়ে চড়ে বসতাম আমি। বলতাম-
কাকু, মাছগুলো আজ তাদের মামাবাড়ি গেছে। তাই না?
আমাকে কাঁধে নিয়ে ছুটতে ছুটতে কাকু বলতো-
'তাই হবে। কাল ফিরলে, পাক্কা ধরা দেবে ওরা।'
'মাছগুলো বড় দুষ্টু। তাই না? কেবলই মামাবাড়ি যায় ওরা।'
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem