এ এক উত্তরণের কাহিনী
রাত প্রায় সাড়ে নটা। বাড়ি ফিরছি আমরা।
রাস্তায় এখনো বেশ ভিড়। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আমি। আর পিছনের সিটে বসে, কাকীমা দিদি তৃষ্ণা।
জানালার মধ্য দিয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে রয়েছি। আলো আঁধারি রাস্তার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে, চিন্তার জগতে হারিয়ে গেলাম আমি।
পুরানো সেই সংঘাত জেগে উঠলো মনে। হ্যাঁ, সংঘাত! এই সংঘাত বড় জ্বালায় আমাকে। আছেন? ঈশ্বর কি আছেন?
ঈশ্বর যদি আছেন, তো আমার শিশুবেলায়, বাবা আমাকে ছেড়ে গেলো কেন? মাকে, ছেড়ে গেলো কেন? বাবা মারা যাওয়ার পর, মা একা। দিদি একা। আমি একা। আমরা সবাই একা।
কত কষ্টে দিন কাটিয়েছে মা। কত কষ্টে দিন কাটিয়েছে দিদি। কত কেঁদেছে মা। কত কেঁদেছে ঠাম্মা। ঈশ্বর যদি করুণাময়, তো এত কষ্ট কেন আমাদের?
মা-ই বেশী কষ্ট পায়। অথচ মা-ই ঈশ্বর বিশ্বাস করে সবচেয়ে বেশী। তার কাছে দুর্ভাগ্যের নাম নাস্তিকতা নয়। তার কাছে যন্ত্রণার নাম নাস্তিকতা নয়। তার কাছে যন্ত্রণা, ঈশ্বর সাধনার মন্ত্র। তার কাছে দুর্ভাগ্য, সৌভাগ্যের আগের স্টেশন।
উদ্ভূত। তাই না? একই যন্ত্রণা, অথচ ভিন্ন জনের কাছে, ভিন্ন তার অর্থ। আমাদের কষ্টের জন্য, ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে পারি নি আমি।
অথচ মা? মায়ের কাছে যন্ত্রণা, ঈশ্বর স্মরণের ঘন্টা ধ্বনি। যন্ত্রণার কারণেই, মা আরও বেশী কোমল। আরও বেশী নির্মল। আরও বেশী অনুভূতি প্রবণ। অথচ সেই একই যন্ত্রণায়, পাথর হয়ে গেছি আমি। নিষ্ঠুর কঠিন হয়ে গেছি আমি।
আমি কি তবে অন্তঃসার শূন্য? আমি কি তবে ক্রোধী নিষ্ঠুর মানুষ? কেবল দোষারোপ করতে চাই আমি। কিন্তু দায়িত্ব নিতে চাই না।? হিংসা করতে চাই আমি। কিন্তু ভালোবাসতে চাই না।
মা এক আলো। ঠাম্মা এক আলো। তৃষ্ণাও এক আলো। এরা পথের আঁধারে, জ্বলন্ত এক প্রদীপ। আমার অবিশ্বাসী জীবনে, গভীর এক বিশ্বাস। আমার দিকভ্রষ্ট জীবনে, মুক্তির পথ।
তৃষ্ণা কিভাবে এলো আমার জীবনে? কিভাবে? ভারতবর্ষের ৬০ কোটি পুরুষের জীবনে, তৃষ্ণার আবির্ভাব ঘটে নি। কেবল আমার জীবনে ঘটলো কেন? তৃষ্ণা কি তবে ঈশ্বর অস্তিত্বের সংকেত? তৃষ্ণা কি তবে ঈশ্বরের ছায়া?
মা বলে, জীবনে শান্তি পাওয়ার প্রথম ধাপ হলো কৃতজ্ঞতা। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা। মহাবিশ্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা। চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা। মা বাবা ঠাম্মা দিদি পরিবার পৃথিবী, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। পৃথিবীর মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কারণ- এদের সবার জন্য বেঁচে আছি আমি।
আমি কি তবে অকৃতজ্ঞ? আমি কি তবে আত্মকেন্দ্রিক মানুষ? আমি কি তবে.....
'কি ভাবছিস অমল? '
কাকীমার প্রশ্নে, ঘোর কাটলো আমার। ঘোর কাটতে বুঝলাম, ভবানীপুর, প্রায় পৌঁছে গেছি আমরা। হেসে উত্তর দিলাম-
কিছু না কাকীমা।
'ভালো লাগলো তৃষ্ণার নাচ? '
খুব ভালো লাগলো। ভাবলাম, সন্ধ্যেটা যদি শেষ না হতো, তো আরও ভালো হতো।
আমার মন্তব্যে অস্বস্তি অনুভব করলো তৃষ্ণা। ওর মায়ের উদ্দেশে ও বললো-
'তোমার অমলকে আজ বড্ড বেশী কাব্যে পেয়েছে মা! দুপুরে নেরুদার কাব্য। সন্ধ্যেয় ওনার নিজের কাব্য। '
দিদি হেসে উঠলো। বললো-
'হুঁ, তাই তো দেখছি তৃষ্ণা। কার জাদুতে রে তৃষ্ণা?
তৃষ্ণা দিদির দিকে চেয়ে হাসলো। কিন্তু কোন উত্তর করলো না। দিদি আবার জিজ্ঞেস করলো-
'এ কি তবে তোর অত্যাচারে? '
তৃষ্ণা
'আমার অত্যাচারে হবে কেন দিদি? দেখো, ডুবে ডুবে কোথায় জল খায় তোমার ভাই। '
দিদি
'তাই? ধরা পড়লে পুকুর আর পানকৌড়ি, দুই-ই সাজা পাবে তখন। '
তৃষ্ণা
'হ্যাঁ, দিও। বেশ করে সাজা দিও ওদেরকে। তুমি না পারলে আমাকেও ডেকো। কান মুলে দেবো আমি।'
কাকীমা এবার ধমকের সুরে তৃষ্ণার উদ্দেশে বললেন-
'ঊহঃ থামবি তোরা? দিন রাত ছেলেটার পিছু লাগিস তোরা! '
মৃদু হাসলাম আমি। বললাম-
বলতে দিন কাকীমা। কদিন আর বলবে? ঢিল মারলে, এবার আমি পাটকেল মারবো আমি।
তৃষ্ণা ভেংচি কেটে বললো-
'হুঁ! পাটকেল মারবে না ছাই! ছাগলের শিং দেখলে জলে পড়ে যায় যে, সে কিনা পাটকেল মারবে! '
এবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সুরে আমি বললাম-
বেশ, তাহলে দেখা যাক।
দিদি কাকীমার উদ্দেশে বললেন-
'দেখলেন কাকীমা? একদিনেই অমল কেমন বদলে গেছে? '
দিদির কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো তৃষ্ণা। বললো-
'অমলবাবু বদলে গেছেন! সে আমি বিশ্বাস করি না। '
কাকীমা
'অমলকে বদলাতে হবে কেন? অমল এমনিতেই সুন্দর।'
তৃষ্ণা
'ও কি তবে চিরকাল হাঁদারাম থাকবে নাকি? '
কাকীমা
'কে হাঁদা, কে চালাক- ঠিক সময়ে টের পাবি তোরা।'
দেখি, গাড়িটা বাড়ির দরজার কাছাকাছি পৌঁছলো। কাকীমার উদ্দেশে বললাম-
'আমরা এসে গেছি কাকীমা।'
তৃষ্ণা বোধহয় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু ওর মা ওর দিকে তাকাতেই, থেমে গেলো ও।
বাড়ির গেটে থামলো গাড়ি। নামলাম আমরা।
কাকীমার দিকে চেয়ে আমি বললাম-
আপনারা ভেতরে যান, সবকিছু নিয়ে আসছি আমি।
কাকীমা দিদি তৃষ্ণা, ওদের ব্যক্তিগত জিনিসগুলো নিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকলেন।
বড় বড় ব্যাগগুলো গাড়ি থেকে নামালাম আমি। তারপর বাড়ির ভিতর ঢুকলাম। ড্রয়িং রুমে পৌঁছতেই, কাকীমা আমার উদ্দেশে বললেন-
'ওগুলো উপরে নিয়ে যা অমল। তৃষ্ণার ঘরে রেখে দে।'
ভারী দুটো ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি চড়তে শুরু করলাম আমি। সিঁড়িতে পা রাখতেই, হটাৎ তৃষ্ণা আমার পিছু নিলো।
দুষ্টুমির গন্ধ পেলাম আমি। সিঁড়ি চড়ার গতিবেগ বাড়ালাম আমি। গতি বাড়ালো তৃষ্ণাও।
সিঁড়িটা যেখানে ১৮০ডিগ্রি টার্ন করেছে, সেখানে পৌঁছতেই দুষ্টুমি শুরু করলো তৃষ্ণা। আমার হাতে চিমটি কাটতে শুরু করলো ও। ব্যাগগুলো বেশ ভারী। না পারছি ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখতে। না পারছি ওর চিমটি উপেক্ষা করতে।
কিছু করছি না দেখে, আরও জোরে চিমটি কাটলো তৃষ্ণা। এবার আমার বুকের উপর।
ব্যাগ দুটো হাতে রেখেই, বুক দিয়ে তৃষ্ণাকে চেপে ধরলাম আমি। সজোরে। সিঁড়ির দেওয়ালে।
তৃষ্ণার বুকের উপর আমার বুক। ও পালিয়ে যেতে চাইলে, আরও জোরে চেপে ধরলাম ওকে। তৃষ্ণা আমার কান দুটো ধরলো। তারপর আমার দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ও। এবার কোন কথা না বলে, আমার ঠোঁটদুটো জোর করে কামড়ে দিলো ও।
আমাকে প্রত্যাঘাত করার সুযোগ না দিয়েই, আমাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিলো ও। তারপর দৌড়ে উপরে উঠে গেলো তৃষ্ণা।
চিনচিন ব্যথা ঠোঁটে। অথচ বুকে অদ্ভুত এক অনুভূতি।
এমন যে ঘটবে, ভাবি নি আমি। ভাবিনি, তৃষ্ণা এসময়ে, এমন দুষ্টুমি করবে। আমাকে এমন করে ব্যথা দেবে।
দেবে, দিক। ক্ষতি কি? আসলে, জীবনে এমন কিছু ব্যথা আছে, যা বারবার পেতে ইচ্ছে করে। জীবনে এমন কিছু ক্ষত আছে, যেগুলোকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। সেই ক্ষতে স্মৃতির মধু ঢেলে, বারবার তারিয়ে তারিয়ে খেতে ইচ্ছে করে।
তৃষ্ণার দেওয়া যন্ত্রণাগুলো, ঠিক সেই রকম।
আচ্ছা, এমন কেন হয়? কেন?
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem