উত্তরণের পথে ৬৯ (Trishna Amal) Poem by Arun Maji

উত্তরণের পথে ৬৯ (Trishna Amal)

এয়ারপোর্ট থেকে, কাকুকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলাম আমরা। দেখি, তার কিছু পরেই মা এসে উপস্থিত।

আগে টের পেলেও, মাকে দেখে চমকে উঠলাম আমি। কেমন যেন লজ্জা হলো আমার।  সংকোচ হলো আমার। এমন লজ্জা বা সংকোচ আগে কখনো হয় নি আমার। আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসলো মা। সে হাসির উত্তর, হাসি দিয়ে করতে পারলাম না আমি। সংকোচের বিহবলতা গ্রাস করলো আমাকে। তাই মাথা নীচু করে প্রণাম করলাম মাকে।

মা কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু কাকীমা এগিয়ে এলেন। মাকে, বুকে জড়িয়ে ধরলেন উনি। তারপর মায়ের হাত ধরে, ঘরে চলে গেলেন।

তৃষ্ণাকে কাছে পিঠে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয় উপরে কোথাও লুকিয়েছে ও।

সংকোচ আর অস্বস্তি কাটাতে, আমিও উপরে উঠে এলাম। ঘরে ঢুকে, একটা গল্প বই তুলে নিলাম হাতে। পড়তে চাইলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু পারলাম না। মন বসলো না। কেমন যেন একটা লজ্জা গ্রাস করলো আমাকে। কেমন যেন এক উদ্বেগ গ্রাস করলো আমাকে। প্রশ্ন জাগলো মনে, মাকে আমি কষ্ট দিচ্ছি না তো?

বেশ কিছুক্ষণ কাটলো। তারপর হটাৎ নীচ থেকে কাকীমার গলার আওয়াজ-
'তৃষ্ণা.. অমল...কোথায় গেলি তোরা? নীচে আয়। খাবার রেডি।'

বুঝলাম, এখুনি না গেলে, কাকীমা আবার ডাকবেন। তাতে অস্বস্তি আরও বাড়বে। তাই সিঁড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। নীচে নামতে গিয়ে দেখি, তৃষ্ণা নামছে। আমার আগে আগে।

আমার পায়ের আওয়াজ শুনে, পিছন ফিরে তাকালো ও। আমাকে দেখে মৃদু হাসি হাসলো। শুকনো হাসি। আমিও হাসলাম। শুকনো হাসি।

ডাইনিং টেবিল সংলগ্ন চেয়ারে বসলাম আমরা। মা আর কাকু পাশাপাশি। তার উল্টোদিকে আমি আর তৃষ্ণা। কাকীমা এক প্রান্তে।

খেতে খেতে, মা আর কাকু তাদের পুরানো দিনের গল্প শুরু করলেন। মাঝে মাঝে কাকীমাও তাতে যোগ দিলেন। কিন্তু তৃষ্ণা নীরব। নিঃশব্দ। আমিও তাই।  

কাকীমার আচরণ বেশ সহজ হলেও, কাকু বেশ গম্ভীর। মাও বেশ গম্ভীর। ওদের গাম্ভীর্য আরও বেশি উদ্বিগ্ন করলো আমাকে। উদ্বিগ্ন করলো তৃষ্ণাকে।

খাওয়া প্রায় শেষ। গাজরের হালুয়া মুখে নিয়ে, কাকু মায়ের দিকে চেয়ে দেখলেন। মা হাসলো। কাকু বললেন-
'দিদি, জরুরি মিটিংটা তাহলে বিকেলেই হোক।'

মা বেশ গম্ভীর সুরে বললো-
'তাই হোক।'

শূন্য এক দৃষ্টিতে, কাকু আর মায়ের দিকে চেয়ে রইলেন কাকীমা। কাকু এবার তৃষ্ণা আর আমার দিকে চেয়ে বললেন-
'শোন, তোদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।'

কথাগুলো বলে, কাকু তৃষ্ণার দিকে চেয়ে দেখলেন। তৃষ্ণার মুখ শুকিয়ে গেলো। কাকু বললেন-
'বিকেল চারটেয় ড্রয়িং রুমে আসিস। মিটিং করবো আমরা।'

কাকীমা যেন কিছু বলতে গিয়ে, নিজেকে সংবরণ করে নিলেন। তারপর দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললেন উনি।

বিপর্যস্ত ভঙ্গীতে, তৃষ্ণা খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গেলো। সকলের আগে। মুখ বেশ শুকনো করে। ওকে উঠে যেতে দেখে কাকীমা ওর দিকে চেয়ে দেখলেন। কিন্তু কিছু বললেন না। মনে হলো, কাকীমা যেন একটু মনে মরা।

একে একে মা কাকু কাকীমা, সবাই উঠে গেলেন। সবার শেষে উঠলাম আমি।  

হাত ধুয়া শেষে, মাকে সঙ্গে নিয়ে কাকু কাকীমা ভেতরে চলে গেলেন। সিঙ্কে হাত ধুয়ে, চারিদিক চেয়ে দেখলাম আমি। নাহঃ তৃষ্ণা নেই। আগেই সরে পড়েছে ও।

উপরে উঠে এলাম আমি। বিছানায় এলিয়ে দিলাম দেহটাকে। কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে আমার! মনে হচ্ছে, পুরোটাই পূর্বকল্পিত এক ষড়যন্ত্র।

মায়ের এখানে আসা, হয়তো পূর্বনির্ধারিত। হয়তো অনেকদিন আগে থেকেই তা ঠিক ছিলো। দিদি যে আমাকে এখানে এনেছিলো, সেটাও বোধহয় এই ষড়যন্ত্রের অংশ। আমি আর তৃষ্ণা এই ষড়যন্ত্রের গিনিপিগ। না জেনেই, ফাঁদে পড়েছি আমরা।

মনে পড়লো বিষ্ণুবাবুর কাছ থেকে শোনা, সেই দর্শন তত্ত্ব। মানুষ যখন কোন কিছু সর্বান্তঃকরণে চায়; সারা মহাবিশ্ব তখন ষড়যন্ত্র করে, তাকে তা দিতে চায়। অথচ মানুষ জন্মান্ধ। জন্মমূর্খ। তার আকাঙ্খিত বস্তু, তার কোলের উপর পড়লেও, তা সে তুলে নিতে পারে না।

তাহলে কি আমার তৃষ্ণা প্রাপ্তি, মহাবিশ্বের সেই ষড়যন্ত্রের অংশ? আমি কি, আমার কোলের উপর পড়ে থাকা জিনিসটা তুলে নিতে, মিছিমিছি ভয় পাচ্ছি? আমার আকাঙ্খিত ভালোবাসার কথা যদি, মুখ ফুটে বলতে না পারলাম, তো তৃষ্ণা আমার হবে কেন?

ওহে অমল, তুমি বড় কাপুরুষ। এক নির্লজ্জ কাপুরুষ! তুমি তোমার দুর্বলতা, তোমার ছোট্ট বয়সের দোহাই দিয়ে ঢাকতে চাও!  যে সিংহ, সে জন্ম থেকেই সিংহ। ছোট বয়সে যে ইঁদুর, সে কি বড় হলে সিংহ হতে পারবে? বড় হলে সে এক ধেড়ে ইঁদুর হতে পারবে। কিন্তু কখনো কি সে, সিংহ হতে পারবে? নাহঃ কখনো না। তুমি যদি সিংহ হও, তো সবসময় তুমি সিংহ। বয়স কোন অজুহাত নয়। তোমার নিঃস্ব অবস্থা কোন অজুহাত নয়।  

নিজেকে শক্ত করলাম আমি। নাহঃ সাহসী আমাকে হতেই হবে। ছোট বয়সের দোহাই দিয়ে, পালিয়ে আমি যাবো না। কতদিন আর ভীরু কাপুরুষ সেজে থাকবো? কতদিন আর বিপদ থেকে মুক্তি পেতে, মা দিদি কাকীমা আর তৃষ্ণার কাছে ভিক্ষা চাইবো? যা আমি চাই, তা আমি মুখ ফুটে বলবো। তা আমি ক্ষমতার জোরে অর্জন করবো। আমাকে তা করতেই হবে।

© অরুণ মাজী

উত্তরণের পথে ৬৯ (Trishna Amal)
Saturday, September 4, 2021
Topic(s) of this poem: poem
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success