মেট্রোতে চড়ে রাসবিহারী পৌঁছলাম। রাসবিহারীর দুটো দোকান, আজ দেখা করতে বলেছিলো আমাকে।
তাদের প্রথমটাতে গেলাম। এখনও বেশ সকাল। তাই দোকানটা ফাঁকা। দোকানের ভিতর এক বয়স্ক ভদ্র লোক বসে রয়েছেন। তাকে জিজ্ঞসে করলাম-
জেঠু, গত কাল শুভ বাবুর সাথে কথা বলেছিলাম। সেলসম্যানের কাজের ব্যাপারে। উনি আমায় আজ আসতে বলেছিলেন। উনি কি আছেন?
'না, শুভ এখন নেই। আমি ওর বাবা। তোর নাম কি অমল? '
হ্যাঁ জেঠু।
'শুভ বলেছে তোর কথা। আগে কখনো ওধুধ দোকানে কাজ করেছিস? '
না জেঠু। তবে এ কাজ কঠিন কিছু হবে না।
'কতদূর লেখা পড়া করেছিস? '
উচ্চমাধ্যমিক। সায়েন্স পড়েছি আমি।
'আয়, ভেতরে আয়।'
দোকানের ভিতর ঢুকলাম আমি। ড্রয়ার থেকে উনি একটা প্রেসক্রিপশন বের করলেন। তারপর সেটা আমার হাতে দিয়ে বললেন-
'ওষুধগুলো সব আলফাবেটিক্যালি সাজানো আছে। প্রেসক্রিপশানের ওষুধগুলো খুঁজে নিয়ে আয়। '
প্রেস্ক্রিপশানটা পড়ে দেখলাম আমি। লেখা আছে-
Cap. Amoxycillin 500 mg,1 cap TDS x 7 days
Tab. Brufen 400 mg,1 tab TDS x 3 days
বেশি সময় নিলাম না। এক মিনিটেই ওষুধগুলো খুঁজে, ওনার পিছনে দাঁড়ালাম আমি। আমার দিকে না চেয়ে উনি বললেন-
'পাচ্ছিস না তো? তোকে অনেক শেখাতে হবে। '
আমি বললাম-
ওষুধগুলো পেয়েছি জেঠু, এই নিন।
উনি যেন একটু চমকে উঠলেন। পিছন ঘুড়ে, আমাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন। আমার মাথা থেকে পা পৰ্যন্ত খুঁটিয়ে দেখলেন উনি। বললেন-
'ভালো বাড়ির ছেলে মনে হচ্ছে। এত বাচ্চা বয়সে কাজ করতে চাস কেন? '
কোন উত্তর করলাম না আমি। ওনার চোখের দিকে চেয়ে রইলাম আমি।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে, আনমনে ঘাড় নাড়লেন উনি। সেই ঘাড় নাড়ার অব্যক্ত অর্থ হলো-
'আজকালকার ছেলেমেয়েরা বড় অদ্ভুত। কিছুই বোঝা যায় না।'
উনি বললেন-
'মাসে তিন হাজার টাকা মাইনে দেবো। সকাল আটটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করবি তুই। আরও দু ঘন্টা বেশি কাজ করলে, আরও এক হাজার টাকা একস্ট্রা দেবো। দুপুরের খাওয়ারও দেবো তোকে।'
চুপ রইলাম আমি। আমাকে চুপ থাকতে দেখে উনি জিজ্ঞেস করলেন-
'রাজি আছিস? '
তবুও কোন কথা বললাম না আমি। কেবল নিঃশব্দে হাসলাম। উনিও হাসলেন। বললেন-
'ঠিক আছে, কাল থেকে কাজ শুরু করে দে।'
আপনি চাইলে আজ থেকেই শুরু করতে পারি। কিন্তু প্লিজ, মাইনে আমাকে প্রতি সপ্তাহে দেবেন। নইলে সংসার চলবে না আমাদের।
উনি আবার আমাকে পর্যবেক্ষণ করলেন। অদ্ভুত এক কৌতূহল নিয়ে। তারপর বললেন-
'ঠিক আছে, তাই হবে। শোন, পুরানো ছেলেটা কাজ ছেড়ে দিয়েছে। তাই বুড়ো বয়সে দোকানে বসে রয়েছি আমি।'
একটা কথা বলবো?
'কি? '
আপনি যদি অনুমতি দেন তো, বাড়িতে খবরটা দিয়ে এখুনি ফিরে আসবো আমি। বাড়িতে বলে আসবো, ফিরতে দেরী হবে আমার।
আমার দিকে চেয়ে হাসলেন উনি। বোধহয় খুশিও হলেন। বললেন-
'ঠিক আছে, যা। বাড়িতে বলে আয়। '
ওনার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম আমি। উনি হাসলেন।
দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। উত্তেজনায় তখনও কাঁপছি আমি।
কাজ পেয়েছি আমি। জীবনের প্রথম কাজ। নাহঃ আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। চার হাজার টাকায়, দিব্যি একমাস চালিয়ে দেবো আমরা।
বাসে চড়ার আর প্রয়োজন মনে করলাম না। প্রায় ছুটতে ছুটতে ফিরে এলাম আমি। উত্তেজনায় হাঁফাচ্ছি আমি।
ঘরের দরজায় ঠক ঠক করে আওয়াজ করলাম। ভেতর থেকে তৃষ্ণার গলার আওয়াজ ভেসে এলো-
'কে? কে আপনি? '
তখনও হাঁফাচ্ছি আমি। কোনক্রমে দম নিয়ে বললাম-
আ....আমি....আমি অমল।
আমার গলার আওয়াজ শুনে, মুহূর্তেই দরজা খুললো তৃষ্ণা। আমাকে হাঁফাতে দেখে ভয় পেয়ে গেলো ও। জিজ্ঞেস করলো-
'একি, হাঁফাচ্ছিস কেন? '
পেয়েছি তৃষ্ণা। পেয়েছি।
'কি পেয়েছিস? কি? '
কাজ। রাসবিহারীতে। ওষুধের দোকানে। চার হাজার টাকা।
তখনও উত্তেজনায় ছটফট করছি আমি। লম্বা বাক্য বলতে পারছি না। ছোট ছোট বাক্যে উত্তর দিলাম আমি।
মুহূর্তেই দরজাটা বন্ধ করলো তৃষ্ণা। তারপর আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো ও। বললো-
'তুই একটা পাগল। ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি আমাকে। তুই যে কাজ পাবি, সে তো সকাল থেকেই জানতাম আমি। তোকে কেউ কাজ না দিয়ে পারে? '
ওর চোখের দিকে চেয়ে এক দৃষ্টিতে রইলাম আমি। তৃষ্ণা বললো-
'তোর মধ্যে সূর্যের দীপ্তি অমল। আয়, মেঝেতে একটু বস। তোর জন্য জল আনছি আমি।'
মেঝেতে বসলাম আমি। তৃষ্ণা জল নিয়ে এলো। জল চুমুক দিতে দিতে বললাম-
জানিস, দারুন আনন্দ হচ্ছে আমার। সেলসম্যানের কাজ তো কি? তাই না?
'আমারও খুব আনন্দ হচ্ছে।'
জানিস? আমাদের দু হাজার টাকা আছে। আর চার হাজার টাকা মাইনে পাবো। আমরা যদি দু হাজার টাকা বাঁচাতে পারি, তো তা দিয়ে তোকে একটা লাল শাড়ী কিনে দেবো। মাকেও একটা তাঁতের শাড়ী কিনে দেবো। আর টাকা যদি একটু কম পড়ে, তাহলে আরও দু সপ্তাহ বেশী কাজ করবো আমি।
তৃষ্ণা আমার দিকে চেয়ে রইলো। ওর চোখদুটো ভিজে গেলো। আমার ডান হাতটা তুলে নিয়ে, ওর গালের উপর তা রাখলো তৃষ্ণা। তারপর বললো-
'তুই শাড়ী কিনে দিলে, সেটা সবসময় পরবো আমি। রাতেও পরবো। '
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem