উত্তরণের পথে খন্ড ৮১ (Trishna Amal) Poem by Arun Maji

উত্তরণের পথে খন্ড ৮১ (Trishna Amal)

কথা বলতে বলতে, বাড়ি পৌঁছলাম আমরা। গাড়িটা ড্রাইভওয়েতে থামলো। কাকীমা আর তৃষ্ণা, গাড়ি থেকে নামলেন। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন ওরা।

আমি আর কাকু গ্যারেজের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে গাড়ি পার্ক করে, বসার ঘরে ফিরে এলাম।

দেখি, তৃষ্ণা সোফাতে বসে রয়েছে। কাকীমা বোধহয় রান্না ঘরে। কাকু আমার দিকে চেয়ে বললেন-
'তুই স্নান করে নে অমল।'

স্নান করতে, উপরে উঠে এলাম আমি। রুমে ঢুকে দেখি, রুমটা বেশ সাজানো। আগের চেয়ে অনেক বেশি গুছানো। চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসলাম আমি। তারপর সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলাম।

নিজেকে বেশ তৃপ্ত মনে হলো। পূর্ণ মনে হলো। মনে হলো, জীবনে অগম্য বা দুর্গম বলে কিছু নেই। কেবল আগে একটু পা বাড়িয়ে দেওয়া। আর তারপর, সব কিছু এমনি এমনি ঘটতে থাকবে।

অথচ কি আশ্চর্য! মানুষ তবুও সেই প্রথম পদক্ষেপটা করতে চায় না। মানুষ ভয়ে মরে। অথচ মানুষ জানে, ভয় শুধু তার মিথ্যে কল্পনায়। বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। নাহঃ আমি কখনো ভয়ের দাসত্ব করবো না। মরার আগে আমি কখনো মরবো না।

চেয়ার ছেড়ে উঠলাম আমি। শাওয়ার স্ক্রীনের মধ্যে ঢুকে, ফোয়ারাটা খুলে দিলাম। ঠান্ডা জল মাথা ছুঁতেই মনে হলো- এ পৃথিবীতে দু ধরণের মানুষ আছে। একদল মানুষ, সাঁতার না জেনেই উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর ডুবতে ডুবতে তারা যখন মরণাপন্ন হয়, তখন তারা সাঁতার শিখে তীরে ফিরে আসে। পৃথিবীর যা কিছু সৃষ্টি, সে সবই, এই ধরণের মানুষ দ্বারা তৈরী।

আর অন্য একদল মানুষ, সাঁতার শেখার জন্য বহু গবেষণা করে। সাঁতারের বই কিনে। পোশাক কিনে। শিক্ষক জোগাড় করে। তারপর তারা শুভক্ষণের জন্য অপেক্ষা করে। পবিত্র পছন্দের দিন ছাড়া তারা নাকি কোন কাজ শুরু করতে পারে না। এত গবেষণা এত অপেক্ষার মাঝে, সাঁতারের প্রতি তাদের আকর্ষণ হারিয়ে যায়। সাঁতার কখনো শেখা হয় না তাদের। পৃথিবীর যত বাধা, যত অন্ধকার; সে সবই এই ধরণের মানুষ দ্বারা তৈরী।

স্নান শেষে যখন পোশাক পরছি, কাকীমার গলার আওয়াজ ভেসে এলো-
'অমল, নীচে আয়। খাওয়ার তৈরী।'

ব্যস্ত হয়ে দ্রুত নীচে নেমে এলাম আমি। দেখি, ডাইনিং টেবিল জুড়ে বসে রয়েছে সবাই। বুঝলাম, আমার জন্য অপেক্ষা করছে এরা।

খালি চেয়ারটায় বসলাম। আমি বসতেই, ফিক করে হেসে উঠলো তৃষ্ণা। কাকু তৃষ্ণাকে জিজ্ঞেস করলেন-
কিরে, হাসছিস কেন তুই?

তৃষ্ণা
'জানো বাপি, অমল একটা পাগল।'

কথাটা বলেই, আবার হো হো করে হেসে উঠলো তৃষ্ণা।

কাকু তৃষ্ণাকে জিজ্ঞেস করলেন
'কেন? অমল পাগল হবে কেন? '

তৃষ্ণা
'ওকেই জিজ্ঞেস করো। মাঝে মাঝে, কোথায় যেন হারিয়ে যায় ও! বাথরুমে ঢুকে, হয়তো টয়লেটেই বসে রইলো আধঘন্টা।'

কাকু
'এতে পাগলামির কি আছে? ভালো কিছু ভাবতে মনঃসংযোগের দরকার। ও তাই করে।'

তৃষ্ণা
'হ্যাঁ, তা জানি। তবে ওর জন্য তখন অন্যদেরকে অপেক্ষা করতে হয়।'

লজ্জা পেলাম আমি। বললাম-
সরি, দেরী করে ফেললাম।

কাকীমা বললেন-
'এতে সরির কি আছে অমল? মনঃসংযোগ খুব ভালো গুণ। চুলোয় যাক, অন্যেরা কি ভাবলো। তুই তোর মতো করে বাঁচবি।'

আমার প্রতি সবার সমর্থন দেখে, তৃষ্ণা বেশ রক্ষণাত্মক হয়ে উঠলো। ও বললো-
'আমার অবশ্য ওর এই পাগলামি ভালোই লাগে। তবে, ওর পিছু লাগতেও ভালো লাগে আমার।'

আবার হো হো করে হেসে উঠলো তৃষ্ণা। কাকুও হাসলেন, আমিও হাসলাম। তৃষ্ণার উদ্দেশে কাকীমা বললেন-
'ঊহঃ আবার দুষ্টুমি শুরু করলি তুই! '

তারপর আমার দিকে চেয়ে কাকীমা জিজ্ঞেস করলেন -
'তোকে খুব জ্বালিয়েছে ও। তাই না? '

হাসলাম আমি। বললাম-
কিছু জ্বালা আছে সে গুলো না পেলেই বরং, বুকটা বেশ খালি খালি লাগে।

হেসে উঠলেন কাকু। বললেন-
'বাহঃ বেশ বলেছিস তুই। তোর কাকীমার কিছু ভর্ৎসনা আছে, সেগুলো যদি না শুনি আমি; তো রাতে ভালো করে ঘুম হয় না আমার। মনে হয়, যেন অনাহারে শুয়ে পড়েছি আমি।'

কাকীমা কপট রাগের ভঙ্গীতে কাকুর দিকে চেয়ে দেখলেন। তারপর উনি বললেন-
'সে কি, এখানে আমাদের কথা আসছে কেন? '

তৃষ্ণা
'আসবে নাই বা কেন? তুমি কি অতিমানুষ নাকি? We all have same instinct.'

কাকীমা কাকুর দিকে প্রশ্নের ভঙ্গীতে চেয়ে দেখলেন। কাকু বললেন-
'I don't disagree with her.'
© অরুণ মাজী

উত্তরণের পথে খন্ড ৮১ (Trishna Amal)
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success