রাতে, পড়াশুনা শেষে, বিছানায় এলাম আমি। কিন্তু নাহঃ। ঘুম এলো না। বাসুবাবুর কথাগুলো মনে পড়লো আবার। আসলে, বাসুদেব সামন্ত এক আগুন। ওনার স্পর্শে এলেই, বুকে আগুন জ্বলে যায় আমার।
উনি বলেন-
'জানিস অমল?
গাইতে গাইতে গায়েন।
বাজাতে বাজাতে বায়েন।
খেলতে খেলতে খিলাড়ী।
এঁড়ে গরুর মতো তর্ক করতে করতে আনাড়ি।
দিন রাত বছর বছর তুই যদি ফুটবল অভ্যাস করিস, তো একদিন তুই ফুটবলার হয়ে উঠবি। তুই কতো ভালো ফুটবলার হবি, তা নির্ভর করবে তোর প্রতিভার উপর। নিষ্ঠার উপর। পরিশ্রমের উপর। কিন্তু বারবার খেললে, তুই যে বেশ ভালো এক খেলোয়াড় হবি, তা প্রায় নিশ্চিৎ।
তুই যদি মাসের পর মাস, বছরের পর বছর জপ করিস- 'আমি সাহসী। আমি দয়ালু'। তাহলে অবশ্যই, তুই একদিন সাহসী দয়ালু হয়ে উঠবি। এ হলো 'দশ জপে ভূতও ভগবান' । 'দশ চক্রে ভগবান ভূত' এর ঠিক উল্টো।
এই তত্বের উপর লক্ষ লক্ষ পাতা গবেষণা হয়েছে। এবং তা প্রমানিত হয়েছে। সাইকোলজিস্টরা এই তত্বের নাম দিয়েছেন 'AUTOSUGGESTION'।
অমল, তুই মানসিকতা বদলে ফেল। বীর সিংহ হওয়ার প্রতিজ্ঞা কর। চিঁ চিঁ চরিত্রের ইঁদুরে ভরে গেছে এ পৃথিবী। এরা ধরিত্রীর রক্ত মাংস খুবলে খাচ্ছে। তুই অন্তত একটা সিংহ শাবক হ। মরবো আমরা সকলেই। তো নেংটি ইঁদুর হয়ে মরবো কেন? মরবো তো সিংহের মতো বুক চিতিয়ে মরবো।'
বাসুদেব সামন্ত যে একজন সিংহ, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
দেখতে, রোগা পাতলা ছাপোষা একটা লোক। অথচ সমস্ত হৈচৈ আর বিজ্ঞাপনের আড়ালে, ছোট ছোট ছেলেদেরকে ইঁদুর থেকে সিংহ বানানোর কাজ করে যাচ্ছেন। নীরবে। নিঃশব্দে।
নাহঃ এদেরকে কেউ চেনে না। এদেরকে কেউ হীরো বলে সন্মান করে না। এদেরকে নিয়ে, কাগজে কেউ লিখে না।
চারিদিকে মূল্যবোধের অবক্ষয়। চারিদিকে শঠতা আর জালিয়াতি। চারিদিকে মুখোশে ঢাকা শয়তান। চোর ডাকাত খুনী ধর্ষক পূজা পাচ্ছে। কিন্তু মানুষের উত্তরণের জন্য কাজ করছে যারা, মানুষ তাদেরকে পাত্তাই দেয় না।
মহত্বের পূজা করলে, মানুষ মহৎ হতে অনুপ্রাণিত হবে। পাপীর পূজা করলে, মানুষ পাপী হতে অনুপ্রাণিত হবে। দেশের মানুষ যদি চোর ডাকাতের পূজা করে, তো দেশ চোর ডাকাতে ভরবে না?
বাসুবাবু একটা কবিতা প্রায়ই বলেন-
এ পৃথিবী বেশ্যার শীৎকার শুনতে ভালোবাসে
ভালোবাসে না সে ওঁম শান্তি বাণী।
এ পৃথিবী মদ খেতে ভালোবসে
খায় না সে দুধ মাখন ননী।
এ পৃথিবী চোর ডাকাত খুনী ভালোবাসে
অপাঙতেয় যত শিক্ষক আর জ্ঞানী।'
বারবার আক্ষেপ করেন উনি। বলেন-
'কি হবে এই ভারতবর্ষের? কি হবে এই বঙ্গদেশের? উচ্ছন্নে গেছে সব। এ দেশ, আগামী দশ হাজার বছরেও জাগবে না।'
কিন্তু অপ্রিয় সত্য যারা বলে, তাদের জীবন সহজ নয়। মাস্টারমশায়ের জীবন তাই সহজ নয়। বাসুদেব সামন্তের জনপ্রিয়তা যেমন আছে। তেমনি আছে অসংখ্য শত্রুও। তাদের কাজই হলো, মাস্টারমশাইকে কষ্ট দেওয়া।
স্কুলে, ওনার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। উনি নাকি ছাত্রদেরকে বিদ্রোহী করে তুলছেন! উনি নাকি ছাত্রদেরকে রাজনীতির সুড়সুড়ি দিচ্ছেন!
এত অভিযোগ, অথচ মাস্টারমশাই অবিচলিত। উনি বলেন-
'আমার পাওয়ার আশা নেই, তাই আমার না পাওয়ার হতাশা নেই।
আমার বড় হওয়ার বাসনা নেই। তাই আমার ছোট থাকার ক্ষোভ নেই।
ছাত্রদের বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়াই আমার সুখ।
আমি চাই, আমার ছাত্ররা যেন কোনদিন নেংটি ইঁদুরের মতো জীবন যাপন না করে।'
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem